বয়স বাড়ার সঙ্গে পুরুষের প্রোস্টেট গ্রন্থিতে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো প্রোস্টেট গ্রন্থি বড় হয়ে যাওয়া বা বিনাইন প্রোস্ট্যাটিক হাইপারপ্লাসিয়া। এটি ক্যানসার নয় এবং সরাসরি প্রোস্টেট ক্যানসারে পরিণতও হয় না। তবে গ্রন্থি বড় হয়ে মূত্রনালিতে চাপ সৃষ্টি করলে ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ, রাতে বারবার প্রস্রাবের জন্য ওঠা, প্রস্রাবের ধারা দুর্বল হয়ে যাওয়া, প্রস্রাব শুরু করতে দেরি হওয়া কিংবা মূত্রথলি পুরোপুরি খালি না হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে, প্রোস্টেট ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় স্পষ্ট উপসর্গ নাও থাকতে পারে। তাই বয়স বাড়ার সঙ্গে প্রোস্টেটের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রস্রাবের কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। খাদ্যাভ্যাস একাই প্রোস্টেটের রোগ প্রতিরোধ করতে পারে—এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই। তবে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, স্বাভাবিক ওজন বজায় রাখা এবং নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড সামগ্রিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি প্রোস্টেটের জন্যও উপকারী হতে পারে।
শাকসবজি ও ফল বাড়ান: প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, ফল ও উদ্ভিদজাত খাবার রাখুন। ব্রকলি, ফুলকপি, বাঁধাকপির মতো সবজিতে নানা ধরনের উদ্ভিজ্জ যৌগ ও পুষ্টি উপাদান রয়েছে। টমেটোতে রয়েছে লাইকোপেন নামের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। কিছু গবেষণায় খাদ্য থেকে বেশি লাইকোপেন গ্রহণের সঙ্গে পুরুষদের মূত্রনালির কিছু উপসর্গ কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে টমেটো বা লাইকোপেনকে কোনো প্রোস্টেট রোগের নিশ্চিত প্রতিষেধক হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
স্বাস্থ্যকর চর্বি বেছে নিন: অতিরিক্ত সম্পৃক্ত ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবারের বদলে বাদাম, বিভিন্ন বীজ, মাছ এবং উদ্ভিজ্জ তেলের মতো স্বাস্থ্যকর চর্বির উৎস বেছে নেওয়া ভালো। মাছ, বিশেষ করে চর্বিযুক্ত মাছ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। খাবারের ক্ষেত্রে তেল ও চর্বির পরিমাণও পরিমিত রাখা প্রয়োজন।
জিঙ্কসমৃদ্ধ খাবার খান: জিঙ্ক শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় একটি খনিজ। কুমড়ার বীজ, বাদাম, শিম ও অন্যান্য ডালজাতীয় খাবারে জিঙ্ক পাওয়া যায়। তবে জিঙ্কসমৃদ্ধ খাবার খেলেই প্রোস্টেটের রোগ প্রতিরোধ বা বিপিএইচের উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ হবে—এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই। তাই প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত জিঙ্ক গ্রহণ না করে সুষম খাদ্য থেকেই পুষ্টি নেওয়া ভালো।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন: শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত পানি পান জরুরি। তবে বিপিএইচের কারণে রাতে বারবার প্রস্রাবের সমস্যা থাকলে ঘুমানোর ঠিক আগে অতিরিক্ত পানি বা অন্যান্য তরল পান না করাই ভালো। একই সঙ্গে ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় কমিয়ে আনা যেতে পারে, কারণ কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এগুলো মূত্রাশয়ের কার্যক্রম বাড়িয়ে প্রস্রাবের বেগ ও ঘন ঘন প্রস্রাবের প্রবণতা বাড়াতে পারে।
লাল ও প্রক্রিয়াজাত মাংস কমান: স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে লাল ও প্রক্রিয়াজাত মাংসের পরিমাণ সীমিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। এর পরিবর্তে মাছ, মুরগি, শিম, ডাল, বাদাম ও অন্যান্য উদ্ভিদজাত প্রোটিন বেছে নেওয়া যেতে পারে। লাল ও প্রক্রিয়াজাত মাংসের অতিরিক্ত গ্রহণের সঙ্গে বিভিন্ন ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে; প্রোস্টেট ক্যানসারের ক্ষেত্রেও সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা চলছে। ([ঈধহপবৎ.ড়ৎম][৩])
আঁশযুক্ত খাবার বাড়ান: গোটা শস্য, ডাল, শাকসবজি, ফল, বাদাম ও বীজ খাদ্যতালিকায় রাখলে পর্যাপ্ত আঁশ পাওয়া যায়। আঁশ হজমশক্তি ভালো রাখতে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে সহায়তা করে। কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে মূত্রাশয়ের ওপর চাপ বাড়তে পারে, ফলে প্রস্রাবের কিছু উপসর্গও বেড়ে যেতে পারে।
স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন: অতিরিক্ত ওজন, বিশেষ করে পেটের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি, নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই সুষম খাবারের পাশাপাশি নিয়মিত হাঁটা বা শারীরিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার চেষ্টা করা উচিত। স্বাস্থ্যকর ওজন, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং শাকসবজি, ফল, গোটা শস্য ও ডালসমৃদ্ধ খাদ্যাভ্যাস ক্যানসারসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
সবশেষে মনে রাখা জরুরি, কোনো একটি খাবার প্রোস্টেটকে রোগমুক্ত রাখার নিশ্চয়তা দেয় না। প্রোস্টেটের সমস্যা প্রতিরোধে এখনো কোনো নির্দিষ্ট খাদ্যাভ্যাসকে নিশ্চিত সমাধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়নি। প্রস্রাবে সমস্যা, রক্ত, ব্যথা বা অন্য কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে খাবারের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
সানা/আপ্র/২/৯/২০২৬