সকালে নিজেই মেয়েকে স্কুলে দিয়ে গিয়েছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা আনসারুল করিম। কয়েক ঘণ্টা পর সেই মেয়েকেই নিজের বাসার প্রধান ফটকের সামনে দ্রুতগতির ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ধাক্কায় রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে হলো তাঁকে। তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী নাওয়াল আনসারীর মাথা, মুখমণ্ডল, কপাল ও দুই হাতে গুরুতর আঘাত লেগেছে। মেয়ের এই দুর্ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে প্রশ্ন তুলেছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা—‘নিজের সন্তানের নিরাপত্তাই যেখানে নিশ্চিত করতে পারি না, সেখানে অন্যের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করব?’
গত সোমবার (৩১ আগস্ট) বেলা দেড়টার দিকে নগরের খুলশি জালালাবাদ সোসাইটির ৩ নম্বর সড়কে এ ঘটনা ঘটে। নাওয়ালের বাবা আনসারুল করিম চট্টগ্রাম নগর পুলিশের গোয়েন্দা উত্তর বিভাগে কর্মরত। এর আগে তিনি খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বিভিন্ন থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
আনসারুল করিম জানান, সকালে তিনি নিজেই মেয়েকে স্কুলে দিয়ে আসেন। স্কুল ছুটির পর বেলা দেড়টার দিকে নাওয়াল একটি ট্যাক্সি থেকে নেমে বাসার প্রধান ফটকের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই দ্রুতগতির একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এসে তাকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ধাক্কায় নাওয়াল ছিটকে রাস্তায় পড়ে গুরুতর আহত হয়।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় নাওয়ালকে প্রথমে জিইসি এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে অন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
ঘটনার পর সোমবার রাতে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া পোস্টে আনসারুল করিম লেখেন, তাঁর মেয়েকে ধাক্কা দেওয়া অটোরিকশাটি ছিল বিদ্যুৎচালিত, অবৈধ ও নিবন্ধনবিহীন এবং সেটি দ্রুত ও বেপরোয়া গতিতে চলছিল। তিনি জানান, দুর্ঘটনায় নাওয়ালের দুই হাত, মাথা, ঠোঁট, পুরো মুখমণ্ডল ও কপালে গুরুতর আঘাত লেগেছে।
‘কত দিন অবৈধ অটোরিকশার কাছে জিম্মি থাকবে মানুষ?’
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সকালে আনসারুল করিম বলেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলোর নির্দিষ্ট কোনো গতিসীমা নেই। চালকেরা অনেক সময় অত্যন্ত বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চালান। তাঁর অভিযোগ, মেয়েকে যে অটোরিকশাটি ধাক্কা দিয়েছে, সেটি অবৈধ ও নিবন্ধনবিহীন ছিল।
ফেসবুক পোস্টে তিনি প্রশ্ন তোলেন, অবৈধ অটোরিকশার চালকদের কাছে দেশের মানুষ আর কত দিন জিম্মি থাকবে। প্রশিক্ষণ ও চালকের বৈধ লাইসেন্স ছাড়া এসব যান চালানোর বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
আনসারুল করিম বলেন, বড় ধরনের অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হলেও বেপরোয়া অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করা যাচ্ছে না। এতে সাধারণ মানুষের জীবন ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। নগরের কোন সড়কে এসব অটোরিকশা চলতে পারবে, সে বিষয়ে সিটি করপোরেশনকে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। কোনো অটোরিকশা জব্দ করা হলে সেটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করার পক্ষেও মত দেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
অভিযান হলেও থামেনি চলাচল
চট্টগ্রাম নগরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কারণে দুর্ঘটনা নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে এসব যানবাহনের ধাক্কা কিংবা অন্য যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষে বহু মানুষ আহত হয়েছেন; ঘটেছে মৃত্যুর ঘটনাও।
গত বছর নগরের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়। পরে মহাসড়কে এসব যান চলাচল নিষিদ্ধ করা হলেও নগরের সড়কে এগুলোর চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
অভিযানের পর নগরের বিভিন্ন অলিগলিতে এসব অটোরিকশার চলাচল আরো বাড়তে দেখা যায়। বর্তমানে সন্ধ্যার পর নগরের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা মূল সড়কেও উঠছে। চকবাজার, ডিসি রোড, বাকলিয়া এক্সেস রোডসহ বিভিন্ন সড়কে রাতের দিকে এসব যান চলাচল করতে দেখা যায়।
ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকির পাশাপাশি এসব যান নিয়ন্ত্রণে অভিযান ও নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। একটি শিশুর আহত হওয়ার ঘটনা সেই পুরোনো প্রশ্নটিকেই আবার সামনে এনেছে—সড়কে অবৈধ ও বেপরোয়া যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা কবে হবে?
সানা/আপ্র/২/৯/২০২৬