কাতার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহে অনিশ্চয়তা আরো দীর্ঘায়িত হয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক এলএনজি পরিবহন এখনো প্রায় বন্ধ থাকায় ইউরোপ ও এশিয়ার ক্রেতাদের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। কাতার এনার্জি নতুন করে সরবরাহ বাতিলের মেয়াদ বাড়িয়েছে। বাংলাদেশেও সেপ্টেম্বরের পর কাতারি এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন অব্যাহত থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, পাকিস্তানের ক্রেতাদের কাতার এনার্জি জানিয়েছে, তাদের নির্ধারিত কিছু এলএনজি সরবরাহ অক্টোবর পর্যন্ত বাতিল হতে পারে। বাংলাদেশে সরবরাহের ক্ষেত্রেও সেপ্টেম্বরের পর বিঘ্ন অব্যাহত থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট ক্রেতাদের জানানো হয়েছে। ইউরোপের আরো কয়েকটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানও একই ধরনের নোটিশ পেয়েছে।
বাংলাদেশ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও খোলাবাজার—দুই উৎস থেকে এলএনজি আমদানি করে। কাতার ও ওমানের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি রয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের সংকটে কাতার থেকে সরবরাহ বারবার ব্যাহত হচ্ছে। এরই মধ্যে পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, ২০২৬ সালে কাতার এনার্জির কাছ থেকে নির্ধারিত সরবরাহের প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত কমে যেতে পারে। চলতি বছরে কাতার থেকে প্রায় ৪০টি এলএনজি কার্গো পাওয়ার কথা থাকলেও এর মধ্যে প্রায় ২০টি কার্গো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশই এসেছিল কাতার থেকে।
ফলে কয়েকটি কার্গো সময়মতো না আসায় দেশের গ্যাস সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। কিন্তু খোলাবাজারের এলএনজির দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ায় অতিরিক্ত আমদানি ব্যয়ও বাড়ছে।
কাতার এনার্জির সর্বশেষ সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু বাংলাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইতালির জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এডিসন জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে নভেম্বরের শুরুর মধ্যে নির্ধারিত আরো পাঁচটি এলএনজি কার্গো সরবরাহ করতে পারবে না কাতার এনার্জি। এর ফলে এপ্রিল থেকে এডিসনের চুক্তির আওতায় বাতিল হওয়া কার্গোর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯টিতে। এসব কার্গোতে প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের কথা ছিল। এর মধ্যে ২১টি কার্গোর বিকল্প ব্যবস্থা করতে পেরেছে এডিসন; এসব কার্গোর পরিমাণ ছিল প্রায় ২০০ কোটি ঘনমিটার গ্যাস।
কাতার এনার্জি মার্চে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে প্রথমবার অনিবার্য পরিস্থিতি বা চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহে বাধ্যবাধকতা স্থগিতের ঘোষণা দেয়। এরপর পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় কয়েক দফায় এর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ সিদ্ধান্তে বাতিল হওয়া সরবরাহ নভেম্বরের শুরু পর্যন্ত গড়িয়েছে। কবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজি পরিবহন পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো সময়সীমা নেই।
বিশ্ববাজারে কাতারি গ্যাসের ঘাটতি: যুদ্ধের কারণে কাতারের এলএনজি রপ্তানি ভয়াবহভাবে কমেছে। আন্তর্জাতিক পণ্যবাজারবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ছয় মাসে কাতার মাত্র ১৮টি এলএনজি কার্গো রপ্তানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৫০৯টি। ফলে দেশটির এলএনজি রপ্তানি প্রায় ৯৬ শতাংশ কমেছে এবং সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার।
কাতার বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি রপ্তানিকারক। যুদ্ধের আগে বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কাতার থেকে আসত। ফলে দেশটির সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন বৈশ্বিক বাজারেও ঘাটতি তৈরি করেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে এলএনজি সরবরাহ বেড়েছে। নাইজেরিয়া ও মালয়েশিয়াতেও উৎপাদন বাড়ছে। নতুন কিছু এলএনজি স্থাপনা উৎপাদনে আসায় ঘাটতির একটি অংশ পূরণ হচ্ছে। তবে কাতারের কমে যাওয়া সরবরাহ পুরোপুরি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
ফলে এশিয়ার কিছু দেশ গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে অন্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। ইউরোপের দেশগুলোও উচ্চমূল্যের খোলাবাজার থেকে অতিরিক্ত এলএনজি কেনার পরিবর্তে মজুত করা গ্যাস বেশি ব্যবহার করছে। যে কার্গোগুলো বাজারে আসছে, সেগুলোও তুলনামূলক বেশি দামে কিনতে সক্ষম ক্রেতারাই পাচ্ছে।
বেশি ঝুঁকিতে বাংলাদেশ: কাতারের এলএনজি সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্নে সব আমদানিকারক দেশ সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। যেসব দেশ এলএনজির ওপর বেশি নির্ভরশীল এবং আমদানির বড় অংশ কাতার বা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সরবরাহকারীর ওপর নির্ভর করে, তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
এই দিক থেকে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে ধরা হচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঝুঁকির মাত্রা আরো বেশি, কারণ দেশের এলএনজি আমদানিতে কাতারের অংশ বড়। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশ কাতার থেকে এসেছিল। ফলে কাতারি সরবরাহ কমে গেলে দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প ও সার্বিক জ্বালানি সরবরাহে চাপ বাড়তে পারে।
তুলনামূলকভাবে জাপানের ঝুঁকি কম। কারণ দেশটি বিভিন্ন উৎসের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এলএনজি সরবরাহের ব্যবস্থা করেছে। ফলে কোনো একটি উৎসে সরবরাহ ব্যাহত হলেও বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ বেশি।
হরমুজ খুললেই কি সংকট কাটবে: হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে গেলেও কাতারের এলএনজি সরবরাহ আগের অবস্থায় ফিরতে সময় লাগতে পারে। কারণ শুধু জাহাজ চলাচল নয়, কাতারের রস লাফান শিল্প এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত উৎপাদন অবকাঠামোও সরবরাহ সক্ষমতাকে সীমিত করছে।
মার্চে হামলায় কাতারের দুটি এলএনজি উৎপাদন ইউনিট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে দেশটির এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতার প্রায় ১৭ শতাংশ বা বছরে ১ কোটি ২৮ লাখ টন উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাতার এনার্জি জানিয়েছে, এসব স্থাপনা মেরামতে তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে সীমিত পরিসরে জাহাজ চলাচল বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। ওই সমঝোতায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য প্রণালিটি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয় ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সংঘাত ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতিতে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল আবার বাধাগ্রস্ত হয়।
এ অবস্থায় কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক হতে শুধু হরমুজ প্রণালি নিরাপদ হওয়াই যথেষ্ট নয়; ক্ষতিগ্রস্ত উৎপাদন সক্ষমতা পুনরুদ্ধারও জরুরি। ফলে বাংলাদেশের মতো কাতারনির্ভর আমদানিকারক দেশের জন্য সামনে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ-ঝুঁকি এবং বাড়তি আমদানি ব্যয়ের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
বিশ্ববাজারে নতুন এলএনজি উৎপাদন ও রপ্তানি অবকাঠামো গড়ে উঠলেও কাতারের সরবরাহ ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ হতে সময় লাগবে। ফলে আগামী কয়েক বছর বৈশ্বিক এলএনজি বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য এবং দামের ওপর মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটের প্রভাব অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
সানা/আপ্র/১/৯/২০২৬