গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

চট্টগ্রামের পানিতে ভয়াবহ জীবাণু, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

জেলা প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম

জেলা প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ২১:২৯ পিএম, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ২১:০৮ এএম ২০২৬
চট্টগ্রামের পানিতে ভয়াবহ জীবাণু, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
ছবি

পানি সংহের পর বাসাবাড়িতে ২০ থেকে ৩০ মিনিট ফুটিয়ে বা ফিল্টারে শোধন করেও কোনো কোনো নমুনায় প্রতি ফোঁটায় প্রায় ৫০০ ব্যাকটেরিয়া থেকে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে -প্রতিনিধির পাঠানো ছবি

একেএম ফজলুল হক: চট্টগ্রাম নগরীর ওয়াসা, নলকূপ ও বাণিজ্যিক জারের পানির মান নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে এক গবেষণায়। গবেষণায় নগরের বিভিন্ন উৎসের পানিতে অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বিপুল পরিমাণ ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য দূষক পাওয়া গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপরিশোধিত পানির প্রতি ফোঁটায় প্রায় ৭০০টি ব্যাকটেরিয়া মিলেছে। বাসাবাড়িতে ২০ থেকে ৩০ মিনিট ফুটিয়ে বা ফিল্টারে শোধনের পরও কোনো কোনো নমুনায় প্রতি ফোঁটায় প্রায় ৫০০টি ব্যাকটেরিয়া থেকে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

চট্টগ্রাম নগরীর প্রায় ৭০ লাখ মানুষের পানির চাহিদা মেটাতে প্রধানত ওয়াসা, নলকূপ ও বাণিজ্যিক জারের পানির ওপর নির্ভর করতে হয়। চট্টগ্রাম ওয়াসা ছয়টি শোধনাগার ও ৪৬টি নলকূপের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৪৮ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করে। তবে এসব পানির গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রণীত মহানগরীর খসড়া মহাপরিকল্পনাতেও।

গত ২ আগস্ট প্রকাশিত ওই খসড়া মহাপরিকল্পনার ‘কাঠামো পরিকল্পনা’ অংশে সুপেয় পানির মান নিয়ে একটি পৃথক অধ্যায় রাখা হয়েছে। সেখানে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘হেলিওন’-এ প্রকাশিত একটি যৌথ গবেষণার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণাটি চট্টগ্রাম নগরের তিনটি প্রধান উৎস-ওয়াসা, নলকূপ ও বাণিজ্যিক জারের পানির গুণগত মান ও বাসিন্দাদের ধারণা নিয়ে পরিচালিত হয়েছিল। গবেষণাটির প্রকাশিত নিবন্ধেও এসব উৎসের পানির মান পরীক্ষা এবং বাসিন্দাদের মতামত নেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।

গবেষণাটি পরিচালনা করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও মালয়েশিয়ায় অবস্থিত নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ গবেষক। তাঁরা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কোতোয়ালি, হালিশহর, বায়েজিদ, চান্দগাঁও, বন্দর ও সরাইপাড়া এলাকা থেকে অপরিশোধিত ও শোধিত পানির ৩৬টি নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করেন। পাশাপাশি পানির মান সম্পর্কে ১৪৯ জন বাসিন্দার মতামত নেওয়া হয়।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, চান্দগাঁও এলাকার ওয়াসার অপরিশোধিত পানিতে প্রতি মিলিলিটারে ১৪ হাজার ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। এক মিলিলিটারে প্রায় ২০ ফোঁটা পানি ধরলে প্রতি ফোঁটায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭০০টি। বন্দর এলাকার নলকূপের অপরিশোধিত পানিতে প্রতি মিলিলিটারে ১৩ হাজার ৫০০টি ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে, অর্থাৎ প্রতি ফোঁটায় প্রায় ৬৭৫টি।

শুধু অপরিশোধিত পানিতেই নয়, বাসাবাড়িতে শোধনের পরও জীবাণু থেকে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। বন্দর এলাকার নলকূপের পানিতে শোধনের পর প্রতি মিলিলিটারে প্রায় ১০ হাজার ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে, যা প্রতি ফোঁটায় প্রায় ৫০০টির সমান। কোতোয়ালি এলাকার ওয়াসার পানিতে অপরিশোধিত অবস্থায় প্রতি ফোঁটায় প্রায় ৫০০টি ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেলেও শোধনের পর তা কমে প্রায় ৪০০টিতে নেমেছে।

গবেষণায় ওয়াসার অপরিশোধিত পানিতে এলাকাভেদে প্রতি মিলিলিটারে ৯ হাজার ২৫০ থেকে ১৪ হাজার, আর বাসাবাড়িতে শোধনের পর ৩ হাজার ৪০০ থেকে ১০ হাজার ৩০০ ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। নলকূপের পানিতে অপরিশোধিত অবস্থায় ৬৮০ থেকে ১৩ হাজার ৫০০ এবং শোধনের পর ৬৮০ থেকে ১০ হাজার পর্যন্ত ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়। বাণিজ্যিক জারের পানিতে অপরিশোধিত অবস্থায় ১৫০ থেকে ১ হাজার এবং শোধনের পর ১০০ থেকে ৬৫০টি পর্যন্ত ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে।

গবেষকদের ধারণা, বাসাবাড়ির ফিল্টার নিয়মিত পরিষ্কার না করা কিংবা ত্রুটিপূর্ণ থাকার কারণেও শোধনের পর পানিতে জীবাণু থেকে যেতে পারে। এমনকি শোধনের পর পানিতে থাকা ভাসমান ক্ষুদ্র কণার পরিমাণ কমার পরিবর্তে কোথাও কোথাও বেড়ে যাওয়ার প্রমাণও পেয়েছেন তাঁরা।

পানির দূষণের উৎস হিসেবে পাইপলাইনের ফুটো, অপর্যাপ্ত নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে জারের পানি প্রক্রিয়াজাত করার বিষয়গুলোও গবেষণায় গুরুত্ব পেয়েছে। গবেষকদের মতে, কর্ণফুলী ও হালদা নদী থেকে পানি সংগ্রহ করে শোধনের পর ওয়াসা সরবরাহ করলেও পাইপলাইনের ফুটো ও আশপাশের নোংরা পানি ঢুকে গ্রাহকপর্যায়ে পানি দূষিত হতে পারে। অন্যদিকে অনিবন্ধিত কারখানায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে জারের পানি প্রক্রিয়াজাত করায় সেখানেও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

গবেষক দলের অন্যতম সদস্য, যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শ্যামল কর্মকার বলেন, গবেষণায় পাওয়া ব্যাকটেরিয়া ও রাসায়নিকের উপস্থিতি দেশে পরীক্ষা করা সম্ভব। এর বাইরেও অসংখ্য অজানা অজৈব দূষক পাওয়া গেছে, যেগুলোর কিছু হয়তো এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

তাঁর মতে, পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের বৈজ্ঞানিক ও টেকসই উপায় হলো বাসাবাড়ির পাশের নালা থেকে শুরু করে ভূগর্ভস্থ ও ভূপৃষ্ঠের পানির উৎস পর্যন্ত সবকিছুকে দূষণমুক্ত করা। তা না হলে পানিচক্রের মাধ্যমে দূষিত পানি আবার মানুষের শরীরে প্রবেশ করবে।

তবে পানির দূষণের দায় নিতে নারাজ চট্টগ্রাম ওয়াসা। সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম বলেন, ওয়াসার পানিতে কোনো ব্যাকটেরিয়া নেই-এ বিষয়ে তিনি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারেন। প্রতি মাসে ২৪০টি স্থান থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয় এবং সেখানে দূষণের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না।

মাকসুদ আলমের ভাষ্য, মূলত গ্রাহকপর্যায়ে গিয়ে পানি দূষিত হতে পারে। সচেতনতা কর্মসূচি চালানোর পরও অনেকে বাসার পানির রিজার্ভার ও ট্যাংক পরিষ্কার রাখেন না। এ ছাড়া বিভিন্ন উন্নয়নকাজের সময় কোথাও পানির পাইপ ফেটে গেলে ময়লা পানি পাইপের ভেতরে ঢুকে দূষণ ঘটাতে পারে। এ ধরনের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওয়াসা মেরামতের ব্যবস্থা করে।

গবেষণায় পানির রাসায়নিক মান নিয়েও উদ্বেগের তথ্য পাওয়া গেছে। পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা অনুযায়ী, পানের পানিতে ক্ষতিকর জীবাণুর উপস্থিতি শূন্য থাকা উচিত। একই বিধিমালায় পানিতে দ্রবীভূত কঠিন পদার্থের আদর্শ মান প্রতি লিটারে ১ হাজার মিলিগ্রাম নির্ধারিত। গবেষণায় বন্দর ও হালিশহর এলাকার নলকূপের পানিতে এই মানের চেয়ে বেশি দ্রবীভূত কঠিন পদার্থ পাওয়া গেছে।

পানির মান নিয়ে বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতাও গবেষণার ফলাফলের সঙ্গে উদ্বেগের মাত্রা বাড়িয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ওয়াসার পানি ব্যবহারকারীদের ৭৬ শতাংশ বলেছেন, তাঁরা এই পানি পানের উপযোগী মনে করেন না। তাঁদের প্রধান অভিযোগ ছিল পানিতে দুর্গন্ধ ও ভাসমান কণার উপস্থিতি। দুর্গন্ধের কথা বলেছেন ৫৬ শতাংশ এবং ভাসমান কণার কথা বলেছেন ১৭ শতাংশ।

অন্যদিকে নলকূপ ব্যবহারকারীদের ৫৮ শতাংশ পানিতে অস্বাভাবিক বাদামি রঙের কথা জানিয়েছেন। শোধন করে পানি পান করার পরও ওয়াসার গ্রাহকদের ১১ শতাংশ এবং নলকূপের গ্রাহকদের ৯ শতাংশ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার তথ্য দিয়েছেন। উভয় উৎসের পানির ব্যবহারকারীদের ৭ শতাংশ করে জন্ডিসে আক্রান্ত হওয়ার কথাও জানিয়েছেন। আক্রান্তদের ৭০ শতাংশের বেশি শিশু।

পানির নিরাপত্তা নিয়ে এমন তথ্য নগরবাসীর জন্য শুধু তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্যঝুঁকির বার্তাই দিচ্ছে না, নগরের সামগ্রিক পানিব্যবস্থাপনা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলছে। শোধনাগার থেকে পানি সরবরাহের পর পাইপলাইন, সংরক্ষণব্যবস্থা এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের ঘরে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের লক্ষ্য পূরণ করা কঠিন হবে।
সানা/আপ্র/১/৯/২০২৬ 
 

সংশ্লিষ্ট খবর

বিদ্যুৎ সংকটে সংসদে দুঃখ প্রকাশ প্রতিমন্ত্রীর
০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিদ্যুৎ সংকটে সংসদে দুঃখ প্রকাশ প্রতিমন্ত্রীর

দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে জাতীয় সংসদে দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ,...

মক্কা চুক্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন নয় ইরান: রাষ্ট্রদূত
০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মক্কা চুক্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন নয় ইরান: রাষ্ট্রদূত

মক্কা চুক্তিকে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো চুক্তি হিসেবে দেখছে না তেহরান। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ভারসাম্য...

গ্যাস সংকটে অর্ধেকে নেমেছে পোশাক উৎপাদন
০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গ্যাস সংকটে অর্ধেকে নেমেছে পোশাক উৎপাদন

তীব্র জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও রফতানি আদেশ কমে যাওয়ায় দেশের তৈরি পোশাক খাত গভীর সংকটে পড়ে...

জ্বালানি সংকটের টেকসই সমাধানে সরকারের মহাপরিকল্পনা
০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জ্বালানি সংকটের টেকসই সমাধানে সরকারের মহাপরিকল্পনা

দেশের চলমান জ্বালানি সংকটের টেকসই সমাধানে বহুমাত্রিক ও সমন্বিত মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বর্তমান সরকা...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ হলো মেসির মহাকাব্য

লিওনেল মেসি ঘোষণা দিয়েছেন, আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে আর খেলবেন না। ৩৯ বছরের এই কিংবদন্তির আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের শেষ দৃশ্য হয়ে রইল গত জুলাইয়ের বিশ্বকাপ ফাইনাল। স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে সেদিন আর্জেন্টিনার হাতে ওঠেনি বিশ্বকাপ। কিন্তু মেসির জন্য সেই হারই যেন তাঁর দুই দশকের আন্তর্জাতিক মহাকাব্যের শেষ পৃষ্ঠা হয়ে থাকল। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন মেসি সঠিক সময়ে অবসর নিয়েছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে