গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে একটি মেয়ে। মাথা ঢাকা সাদা হুডিতে। ভারতের মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তির সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষার (নিট) প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে শামিল কয়েকজনকে পুলিশ তুলে নিয়ে যাচ্ছিল সেই ভ্যানেই।
ভ্যানচালক কয়েকবার ইঞ্জিন জোরে চালিয়ে ওই তরুণীকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু মেয়েটি জায়গা ছাড়েননি একচুল পরিমাণ। ওই তরুণীর দৌলতেই কার্যত তারা বাধ্য হয় আন্দোলনকারীদের ছেড়ে দিতে। মাথায় হুডি পরা সেই তরুণীর ছবি, ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সোশাল মিডিয়ায়। সেই থেকে আলোচনা এবং প্রশ্ন কে এই তরুণী।
অনেকেই তাকে ‘সাহসী’ হিসেবে প্রশংসা করছেন। তিনি রিয়া আহির, পেশায় মডেল, অভিনেত্রী এবং একজন উদ্যোক্তা। রিয়া ‘রিয়াসত’ নামে একটি উদ্যোগ শুরু করেছেন এক বছর হল। এর লক্ষ্য, স্থানীয় কারুশিল্পীদের তৈরি পণ্য সরাসরি ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে জাতীয় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন অনিয়মের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করছিলেন।
আন্দোলনের এক পর্যায়ে পুলিশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটক করে একটি ভ্যানে তোলে। সে সময় শিবাজি পার্কের কাছে হেঁটে আসছিলেন ২৭ বছর বয়সি রিয়া। রিয়া বলেন, “প্রথমে মনে হয়েছিল, অকারণে ছেলেমেয়েদের আটক করা হয়েছে।” আন্দোলনকারীদের ব্যক্তিগতভাবে কাউকে না চিনলেও তাদের স্লোগান শুনে আর চুপ করে থাকতে পারেননি তিনি, তাই দৌড়ে গিয়ে ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েন।
রিয়া বলেন, “দেখলাম ভ্যানের ভেতরে অনেক মানুষকে তোলা হয়েছে। একজন নারীকে বের করে আনার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পুলিশ বাধা দেয় আমাকে। তখন আমি ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়ে যাই। পুলিশকে বলি যে তাদের ছেড়ে দিতেই হবে।”
ঘটনার কথা বলতে গিয়ে রিয়া আরও বলেন যে, তিনি কোনো পরিকল্পনা করে এগিয়ে যাননি। পরিস্থিতি দেখে তাৎক্ষণিকভাবেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
তার আশঙ্কা ছিল, আন্দোলনকারীদের নিয়ে যাওয়া হলে তাদের বিরুদ্ধে হয়ত মামলা হবে বা দীর্ঘ সময় আটক থাকতে হতে পারে। একজন নাগরিক হিসাবে নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন বলেই মনে করেন তিনি।
রিয়া বলেন, “সে দিন যদি কিছু না করাতম, তা হলে নিজের কাছেই ছোট হয়ে যেতাম।” জীবনে এই প্রথম তিনি কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলনে অংশ নেন রিয়া।
তার কথায়, তিনি ভেতরে ভেতরে কাঁপছিলেন। তবুও ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন সাহস করে। শেষ পর্যন্ত, পুলিশ আন্দোলনকারীদের ছেড়ে দেয়। মুক্তি পাওয়ার পরে অনেকেই রিয়াকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন এবং তার সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন।
রিয়ার পরিবারের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সম্পর্ক রয়েছে। তার বাবা ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশে কর্মরত ছিলেন। সাহস কি রক্তে আছে? এই প্রশ্নে তিনি বলেন, “জানি না, সাহসটা কোথা থেকে পেলাম। হয়ত সাহস আমার রক্তেই আছে।”
মনোবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেছিলেন রিয়া। তবে কাজের কারণে স্নাতক শেষ করে হয়ে ওঠা হয়নি। বর্তমানে মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরশিক্ষা কর্মসূচিতে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়ছেন রিয়া।
রিয়া মনে করেন, কেবল প্রশ্নফাঁস নয়, ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার বিস্তৃত সমস্যাগুলোর বিরুদ্ধেই মানুষের কথা বলা প্রয়োজন। রিয়ার কথায়, “এটা শুধু নিট পরীক্ষার বিষয় নয়, পুরো ব্যবস্থার সমস্যা।”
ডিসি/আপ্র/২৫/০৭/২০২৬