খালি পায়ে হেঁটে বেড়ান, কাজ তার মানুষ দেখা। হাটবাজারে, যেখানে জনসমাগম সেখানে ভবঘুরে হয়ে ঘুরে বেড়ান। ফরিদপুর শহরে সকলেই চেনে তাকে ‘লাইলি খালা’ নামে। গতকাল নজরুল জয়ন্তীতে ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথির বাইরে মঞ্চে উঠে গান গেয়ে মুগ্ধ করেছেন।
ফরিদপুরের মানুষ তার গানের সঙ্গে পরিচিত হলেও নেটিজেনরা যেন চিনলেন গতকালের এ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। জীর্ণ শাড়িতে, তিনি গাইছেন নজরুলের ‘নয়নভরা জল গো তোমার...’।
তার গায়কি ও কণ্ঠে মুগ্ধ দেশের নামি-দামি শিল্পী ও সুধীজনরা। অনেকেই তার পোস্টটি শেয়ার করে লিখছেন নানা মুগ্ধতার কথা। কিন্তু তিনি কি এসব জানেন? লাইলি খালা সম্পর্কে বিস্তারিত জানালেন ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মফিজ ইমাম মিলন।
এক কন্যা ও এক পুত্রের জননী লাইলি সংসারত্যাগী মানুষ। সন্তানরা বড় হয়ে গেছে। সংসার হয়েছে তাদের।
কিন্তু লাইলি সংসারে ফেরেননি। কথিত আছে, কোনও ভিসা-পাসপোর্ট ছাড়াই তিনি পায়ে হেঁটে প্রায়ই চলে যান আজমীর শরীফে।
মফিজ ইমাম মিলনের সঙ্গে তার পরিচয়, যখন মিলন ২০০০-২০০৮ সালে শিল্পকলা একাডেমির সেক্রেটারি ছিলেন। তখন প্রায়ই এই নারীকে দেখতে পেতেন, সাহায্যের জন্য আসতে। তার গান শুনে মুগ্ধও হয়েছিলেন তিনি।
শিল্পকলা একাডেমিতে যেখানে গানের চর্চা হতো, সেখানে চুপচাপ বসে থাকতে দেখা যেত লাইলিকে। মিলনের সহযোগিতায় ওস্তাদরাও তাকে সহযোগিতা করতেন। খুব অল্প সময়েই হারমোনিয়াম শিখে নিয়েছিলেন লাইলি।
“আমি প্রায়ই বলতাম, আপনি এভাবে রাস্তায় রাস্তায় হাঁটেন, দেখে তো খারাপ লাগে। লাইলি বলতেন, ‘আমি মানুষ দেখি, দুনিয়াতে কত রকমের মানুষ। এত মানুষ, কারো সঙ্গে কারো মিল নাই, মানুষ দেখতে আমার ভাল্লাগে।’ তিনি নূরজাহান, মেহেদী হাসান কিংবা লতা মঙ্গেশকরের গান এমনভাবে গেয়ে শোনাবেন, আপনি মুগ্ধ হয়ে যাবেন।”
তার গানের ভক্ত হয়ে উঠেছেন ফরিদপুরের সংসদ সদস্যরাও। ২ এপ্রিল ফরিদপুর হেরিটেজ শীর্ষক এক আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ। ছিলেন সংসদ সদস্যরাও। তাদের উপস্থিতিতে গান গেয়ে মঞ্চ মাতিয়ে রেখেছিলেন ‘লাইলি খালা’।
সে ধারাবাহিকতায় নজরুল জয়ন্তীতেও তার ডাক আসে।
ফরিদপুরে অবস্থিত উপমহাদেশের রাজনীতির আঁতুড়ঘর বলে খ্যাত ময়েজ মঞ্জিল, যেখানে নজরুলও এসেছিলেন, সেখানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নজরুলের দুটি গান পরিবেশন করেন লাইলি।
তার গানের ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
পোস্টটি শেয়ার করেছেন সংস্কৃতি অঙ্গনের অনেকেই। শেয়ার করেছেন, আনু মুহাম্মদ, সংগীতশিল্পী মৌসুমী ভৌমিক, শারমিন সুলতানা সুমি, সাংবাদিক মুন্নি সাহাসহ অনেকেই। ভাইরাল পোস্টের নিচে কমেন্টবক্সে কেউ লিখেছেন, “লাইলি খালার গলা অসাধারণ। শুধুমাত্র দারিদ্র্যের কষাঘাতে উনি কোথাও সুযোগ পেলেন না।”
কেউ লিখেছেন, “কতটা প্রেম, কতটা ভালোবাসা থাকলে কাজী নজরুলের কবিতা এভাবে বুকের ভিতর লালন-পালন করা যায়।” অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফরিদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য নায়াব ইউসুফ আহমেদ।
এছাড়াও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফাতেমা ইসলাম, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আফজাল হোসেন খান পলাশ, নাট্যকার-শিক্ষক ড. অনুপম হায়াৎ, প্রবীণ সাংবাদিক ও ইতিহাসবিদ বদিউজ্জামান চৌধুরী, ফরিদপুর ফাউন্ডেশনের গোলাম মহিউদ্দিন মুন্না ও জেলা জিয়ামঞ্চের আহ্বায়ক আব্দুস সালাম।
অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন সমাজসেবক প্রফেসর এম এ সামাদ।
ডিসি/আপ্র/২৫/০৫/২০২৬