নিট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষাক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের পর অবশেষে পদত্যাগ করেছেন ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। তাঁর পদত্যাগের পর তরুণদের নেতৃত্বাধীন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) দিল্লির যন্তর মন্তরে চলমান আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে।
শনিবার (২৫ জুলাই) কেন্দ্রীয় সরকার ও সিজেপির প্রতিনিধিদের মধ্যে তৃতীয় দফা বৈঠকের পর এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে যন্তর মন্তরে অবস্থানরত সমর্থকদের বাড়ি ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানায় সংগঠনটি।
সিজেপির প্রধান দাবি ছিল শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। শনিবার তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি পরিস্থিতির দায় স্বীকার করেছেন এবং কখনো দায়িত্ব থেকে সরে যাননি।
তিনি লেখেন, পরীক্ষার অনিয়মের কারণে কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখা, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষা এবং পরিস্থিতির সুযোগ যাতে কোনো রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি নিতে না পারে-এসব বিষয় বিবেচনা করে তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এর আগে নিট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, দুর্নীতি এবং পরীক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করে সিজেপি। পরে আন্দোলনটি দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও এতে সমর্থন জানান।
তিন দাবিতে অনড় ছিল সিজেপি: আন্দোলনকারীদের মূল দাবি ছিল তিনটি। প্রথমত, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। দ্বিতীয়ত, আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী ও সংগঠকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার নিশ্চয়তা। তৃতীয়ত, নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার পর আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারকে এক কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, সরকারের সঙ্গে তিন দফা আলোচনার পর তাদের প্রথম দাবি পূরণ হয়েছে। তিনি জানান, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ক্ষতিপূরণের বিষয়েও সরকার আশ্বাস দিয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিং। সিজেপির পক্ষে ছিলেন সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাসহ অন্য নেতারা।
তেলাপোকা’ মন্তব্য থেকেই আন্দোলনের শুরু: সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে আন্দোলনের বিজয় ঘোষণার সময় ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্য থেকেই এই আন্দোলনের সূত্রপাত।
অভিজিৎ বলেন, ‘‘তিনি যদি আমাদের তেলাপোকা না বলতেন, তাহলে আমি ভারতে আসতাম না, এই আন্দোলনও শুরু হতো না।’’
এর আগে সুপ্রিম কোর্টের একটি শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত তরুণদের একটি অংশকে ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে তিনি ব্যাখ্যা দেন, মন্তব্যটি বেকার তরুণদের উদ্দেশে নয়, বরং ভুয়া আইন ডিগ্রিধারীদের বিষয়ে করা হয়েছিল।
এই মন্তব্যের পর যুক্তরাষ্ট্রে থাকা অভিজিৎ দিপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানান এবং পরে ককরোচ জনতা পার্টি গঠনের ঘোষণা দেন। ব্যঙ্গাত্মক নামের এই সংগঠন দ্রুত তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায়।
বিরোধীদের দাবি, এটি তরুণদের জয়: শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগকে তরুণ সমাজের বড় বিজয় হিসেবে দেখছে ভারতের বিরোধী দলগুলো। তবে তারা জানিয়েছে, আন্দোলনের দাবি এখানেই শেষ নয়।
লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী বলেন, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠনের পথে একটি বড় পদক্ষেপ। তিনি আন্দোলনকারী তরুণদের অভিনন্দন জানান।
তবে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া এবং আন্দোলনকারীদের ওপর বলপ্রয়োগকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ বলেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের চাপে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি আন্দোলনকারীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগের তদন্ত ও দায়ীদের জবাবদিহি দাবি করেন।
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেন, ভারতের শিক্ষার্থীদের কণ্ঠ শেষ পর্যন্ত সরকারের কাছে পৌঁছেছে। তিনি এটিকে লাখো তরুণের জয় বলে মন্তব্য করেন।
সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব বলেন, এই আন্দোলনের শিক্ষা হলো-ভবিষ্যতে কোনো পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া উচিত নয়।
আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল একে গণতন্ত্রের বড় জয় হিসেবে উল্লেখ করেন।
সিজেপি জানিয়েছে, আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে সরকারের সঙ্গে আবারো আলোচনা হবে। এদিকে আন্দোলন প্রত্যাহারের পর শনিবার সন্ধ্যায় যন্তর মন্তরে উল্লাস করেন সংগঠনটির সমর্থকেরা। সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, হিন্দুস্তান টাইমস, এনডিটিভি
সানা/আপ্র/২৫/৭/২০২৬