রাজধানীর মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে উদ্ধার করা শক্তিশালী পাইপ বোমাটি (আইইডি) সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উল্টোরথ যাত্রার পথ লক্ষ্য করে রাখা হয়েছিল বলে ধারণা করছে পুলিশ। শোভাযাত্রাটি ওই এলাকা অতিক্রম করার সময় বোমাটি ঘিরে রেখেছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে উপস্থিত মানুষকে আতঙ্কিত না করতে পুলিশ তখন জানিয়েছিল, সেখানে ‘শর্ট সার্কিট’ হয়েছে।
এ ঘটনায় মতিঝিল থানায় দায়ের করা বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
পুলিশের ভাষ্য, বোমাটি আগেই শনাক্ত করতে পারায় বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তবে কারা এবং কী উদ্দেশ্যে এটি সেখানে রেখেছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি তদন্ত করছে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (সিটিটিসি) মোহাম্মদ শামসুল হক বলেন, ছাতার সঙ্গে বোমাটি এমনভাবে সংযুক্ত করা হয়েছিল যে কেউ কৌতূহলবশত ছাতা খুললেই বিস্ফোরণ ঘটতে পারত। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটার আশঙ্কা ছিল।
রথযাত্রার সময় ঘিরে রেখেছিল পুলিশ: মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, উল্টোরথ যাত্রার নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করছিলেন মতিঝিল থানার এসআই মো. মুক্তা। শোভাযাত্রার পথ ছিল ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে মতিঝিলের শাপলা চত্বর হয়ে স্বামীবাগ আশ্রম পর্যন্ত।
শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে ট্রাফিক বিভাগ থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের জেনারেটর কক্ষের পাশে একটি পরিত্যক্ত ছাতার মধ্যে বোমাসদৃশ বস্তু থাকার তথ্য দেওয়া হয়।
পরে পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে এলাকা ঘিরে ফেলেন। মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, ওই সময় রথযাত্রার মিছিল সেখানে পৌঁছালে পুলিশ সদস্যরা অংশগ্রহণকারীদের ‘শর্ট সার্কিট হয়েছে’ জানিয়ে স্থানটি এড়িয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন।
পরে শোভাযাত্রা চলে গেলে ঢাকা মহানগর পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে বোমাটি নিষ্ক্রিয় করেন।
ছাতার ভেতরে ছিল পাইপ বোমা: গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) প্রথমে পুলিশ জানিয়েছিল, পরিত্যক্ত ছাতার ভেতরে একটি ককটেল পাওয়া গেছে। পরে বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের কর্মকর্তারা জানান, এটি ছিল শক্তিশালী পাইপ বোমা।
ডিএমপির বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের এক কর্মকর্তা বলেন, বোমাটির ভেতরে প্রায় দেড় কেজি সালফার, তারকাঁটা ও ধারালো লোহার টুকরো ছিল। ব্যাটারি ও সার্কিটের মাধ্যমে এমনভাবে এটি তৈরি করা হয়েছিল, যাতে ছাতা খোলার সময় চাপ পড়লেই বিস্ফোরণ ঘটে।
তিনি বলেন, বিস্ফোরণ হলে লোহার টুকরোগুলো ছিটকে গিয়ে আশপাশের মানুষের শরীরে আঘাত করতে পারত।
ঘটনাস্থল থেকে আলামত হিসেবে জিআই পাইপের খণ্ডিত অংশ, ব্যাটারি, বিয়ারিংয়ের বলসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
রথযাত্রাকে লক্ষ্য করে রাখার সন্দেহ: পুলিশ কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, উল্টোরথ যাত্রাকে লক্ষ্য করেই বোমাটি রাখা হয়ে থাকতে পারে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে যেতে চাইছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে বোমাটি রাখা হয়েছিল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তবে বিষয়টি তদন্তাধীন।
সিটিটিসির অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক বলেন, শুধু সিটিটিসি নয়, অন্য সংস্থাও ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত করছে। কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল, তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে।
নিষ্ক্রিয়করণের সময় আহত পথচারী: বোমাটি নিষ্ক্রিয় করার সময় এক পথচারী আহত হয়েছেন। আহত ব্যক্তি ৬৬ বছর বয়সী মিরাজ আহমেদ। তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী।
পুলিশ জানায়, তাঁর বাম চোখে বিস্ফোরণের সময় ছিটকে আসা একটি অংশ লাগে। পরে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে আগারগাঁওয়ের চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে।
সানা/ডিসি/আপ্র/২৫/৭/২০২৬