বিশ্বকাপ মানেই স্বপ্ন। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল মঞ্চে নামার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই প্রতিটি ফুটবলার বছরের পর বছর পরিশ্রম করেন। কেউ আলো ছড়ান, কেউ নায়ক হয়ে ওঠেন, আবার কেউ একটি গোল বা একটি সেভে ইতিহাসে জায়গা করে নেন। কিন্তু বিশ্বকাপের আরেকটি নির্মম বাস্তবতাও আছে। ১,২৪৮ জন ফুটবলার ২০২৬ বিশ্বকাপের স্কোয়াডে জায়গা পেলেও সবাই মাঠে নামার সুযোগ পাননি। কেউ চোটের কারণে, কেউ কোচের কৌশলগত সিদ্ধান্তে, আবার কেউ শক্তিশালী প্রতিযোগিতার কাছে হার মেনে পুরো টুর্নামেন্ট বেঞ্চে বসেই কাটিয়েছেন। এমনই ১০ ফুটবলারের গল্প, যাদের বিশ্বকাপ স্মৃতিতে থাকবে, কিন্তু খেলার মিনিটের খাতায় থাকবে শূন্য।
এন’গোলা কন্তে (ফ্রান্স)
ফ্রান্সের ২০১৮ বিশ্বকাপজয়ী দলের অন্যতম নায়ক ছিলেন এন’গোলা কন্তে। মাঝমাঠে তার অক্লান্ত পরিশ্রম ও বল দখলের দক্ষতা একসময় ছিল ফরাসি দলের সবচেয়ে বড় শক্তি। বলা হয়ে থাকে, কন্তে না থাকলে হয়তো ফ্রান্স ২০১৮ বিশ্বকাপ জিততেও পারতো না। এখন বয়স তার ৩৫। তবুও অনেকের প্রত্যাশা ছিল অন্তত কিছু সময়ের জন্য হলেও কন্তেকে মাঠে দেখা যাবে। কিন্তু কোচ দিদিয়ের দেশম তা করেননি। এমনকি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচেও কন্তেকে এক মিনিটের জন্যও মাঠে নামানো হয়নি। বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে, অথচ অভিজ্ঞ এই মিডফিল্ডারের বুটে লেগে থাকেনি একটি বলও।
কোবি মাইনু (ইংল্যান্ড)
মাত্র দুই বছর আগে ইউরো ২০২৪-এর ফাইনালে ইংল্যান্ডের হয়ে শুরুর একাদশে ছিলেন কোবি মাইনু। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে বিশ্বকাপে তার ভূমিকা সীমাবদ্ধ হয়ে যায় বেঞ্চে বসে থাকা। ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডে তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে সুযোগ পাননি তিনি। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের আগেই অসুস্থ হয়ে পড়ায় শেষ সুযোগটিও হাতছাড়া হয়। ফলে ইংল্যান্ডের একমাত্র আউটফিল্ড খেলোয়াড় হিসেবে পুরো বিশ্বকাপে এক মিনিটও খেলতে পারেননি মাইনু।
ভিক্টর মুনিয়োজ (স্পেন)
বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য হওয়া নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। কিন্তু ভিক্টর মুনিয়োজের জন্য সেটি ছিল শুধুই স্কোয়াডের সদস্য হওয়ার আনন্দ। লিভারপুলের নতুন এই ফরোয়ার্ড টুর্নামেন্টের শুরুতেই চোটে পড়েন। প্রথম কয়েকটি ম্যাচ মিস করার পর আর একাদশে ফেরার সুযোগ পাননি। স্পেন বিশ্বকাপ জিতেছে, কিন্তু মাঠে নেমে সেই সাফল্যে সরাসরি অবদান রাখার সুযোগ হয়নি তার।
ডেভিড রায়া (স্পেন)
একজন প্রিমিয়ার লিগ গোল্ডেন গ্লাভসজয়ী গোলরক্ষক হয়েও পুরো বিশ্বকাপ বেঞ্চে কাটাতে হয়েছে আর্সেনালের ডেভিড রায়াকে। এমনকি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল খেলেছেন তিনি। দলকে নিয়ে গিয়েছিরেন টাইব্রেকার পর্যন্ত। যদিও সেখানে ভাগ্যের খেলায় হোঁচট খেয়েছে তার দল; কিন্তু ডেভিড রায়া ছিলেন আর্সেনালের পরীক্ষিত এক নম্বর গোলরক্ষক। অথচ বিশ্বকাপে এক মিনিটের জন্যও সুযোগ পাননি তিনি। কারণ, স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের প্রথম পছন্দ উনাই সিমন পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত খেলেছেন এবং মাত্র একটি গোল হজম করেছেন। ফলে রায়ার সামনে সুযোগের দরজা আর খোলেনি।
জেমস ট্র্যাফোর্ড (ইংল্যান্ড)
জর্ডান পিকফোর্ডের পরিবর্তে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ডিন হেন্ডারসন সুযোগ পেলেও জেমস ট্র্যাফোর্ডের ভাগ্য বদলায়নি। ম্যানচেস্টার সিটিতে যেমন প্রায়ই বেঞ্চে থাকতে হয়, বিশ্বকাপেও সেই একই অভিজ্ঞতা হয়েছে তার। পুরো টুর্নামেন্টে মাঠে নামার সুযোগই পাননি তরুণ এই গোলরক্ষক।
ব্রেমার (ব্রাজিল)
ব্রাজিলের রক্ষণভাগে গ্যাব্রিয়েল ও মারর্কুইনহোসের উপস্থিতি ছিল প্রায় অটুট। সে কারণেই জুভেন্টাসের ডিফেন্ডার ব্রেমারের সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম ছিল। শেষ পর্যন্ত সেটিই সত্যি হয়েছে। বিশ্বকাপে তার নাম স্কোয়াডে থাকলেও মাঠে দেখা যায়নি একবারও।
রোনাল্ড আরাউহো (উরুগুয়ে)
রোনাল্ড আরাউহোর না খেলার পেছনে অবশ্য ছিল বড় কারণ। বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগে চোটে পড়ায় সৌদি আরব ও কেপ ভার্দের বিপক্ষে প্রথম দুই ম্যাচ খেলতে পারেননি তিনি। এরপর আর দলে ফিরেও সুযোগ মেলেনি। উরুগুয়ে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেওয়ায় বিশ্বকাপ তার জন্য শেষ হয়ে যায় বেঞ্চেই বসে।
আলেহান্দ্রো গ্রিমালদো (স্পেন)
ব্যক্তিগতভাবে এটি ছিল গ্রিমালদোর জন্য দারুণ একটি বছর। বিশ্বকাপ জিতেছেন, আবার বায়ার লেভারকুসেন ছেড়ে যোগ দিয়েছেন অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদে। তবে বিশ্বকাপে তার ভূমিকা ছিল দর্শকের মতো। বাঁ-প্রান্তে মার্ক কুকুরেয়ার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণে একবারও মাঠে নামতে পারেননি তিনি।
গনসালো ইনাসিও (পর্তুগাল)
রুবেন দিয়াস ও রেনাতো ভেইগার জুটি পুরো টুর্নামেন্টেই কোচ রবার্তো মার্টিনেজের আস্থা অর্জন করে নেয়। ফলে স্পোর্টিং লিসবনের ডিফেন্ডার গনসালো ইনাসিও অপেক্ষা করেই কাটান পুরো বিশ্বকাপ। সুযোগ আর আসেনি।
মাতস ভিফার (নেদারল্যান্ডস)
হুরিয়েন টিম্বার চোটে ছিটকে যাওয়ার পর অনেকেই ভেবেছিলেন মাতস ভিফারের সামনে সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু নেদারল্যান্ডসের ডান প্রান্তে ডেনজেল ডামফ্রিস পুরো টুর্নামেন্টে এক মিনিটের জন্যও বিশ্রাম নেননি। ফলে ভিফারের বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে বেঞ্চেই বসে।
বিশ্বকাপে একটি স্কোয়াডে জায়গা পাওয়াও বিশাল সম্মানের। তবু একজন ফুটবলারের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন থাকে মাঠে নেমে দেশের হয়ে লড়াই করার। এই ১০ ফুটবলারের জন্য ২০২৬ বিশ্বকাপ তাই একই সঙ্গে গর্বের এবং আক্ষেপের। তারা বিশ্বকাপের অংশ ছিলেন, পদক বা স্মারক পাবেন, কিন্তু টুর্নামেন্টের পরিসংখ্যানে তাদের নামের পাশে খেলার সময় লেখা থাকবে মাত্র শূন্য মিনিট।
ডিসি/আপ্র/২৫/০৭/২০২৬