রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন এবং জননিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি পুলিশ বাহিনী। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে পুলিশকে প্রায়ই একটি পেশাদার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা না করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতীকী পরীক্ষাগারের মতো ব্যবহার করা হয়। ফলে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কখনো নাম, কখনো স্থাপনা, কখনো প্রতীক, আবার কখনো ইউনিফর্ম পরিবর্তনের প্রবণতা তৈরি হয়। পুলিশের পোশাকে সাম্প্রতিক পরিবর্তন সেই দীর্ঘস্থায়ী প্রবণতারই আরেকটি প্রতিফলন।
প্রশ্ন হলো, একটি বাহিনীর কার্যকারিতা, জনআস্থা কিংবা পেশাগত উৎকর্ষ কি কেবল তার পোশাকের রঙে নির্ধারিত হয়? বাস্তবতা বলছে, এর উত্তর স্পষ্টভাবে নেতিবাচক। পুলিশ বাহিনীর শক্তি নিহিত থাকে তার নিরপেক্ষতা, পেশাদারিত্ব, দক্ষতা, মানবিকতা এবং আইনের প্রতি অবিচল আনুগত্যে। ইউনিফর্ম কেবল বাহ্যিক পরিচয়ের প্রতীক; কিন্তু প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার কর্মদক্ষতা, আচরণ এবং নৈতিক অবস্থানের মাধ্যমে।
অনেক থানার সামনে আজও লেখা থাকে-সেবাই পুলিশের ধর্ম। এই বাক্যটি কেবল একটি স্লোগান নয়, বরং রাষ্ট্রীয় দর্শনের একটি মৌলিক ঘোষণা। পুলিশ বাহিনীকে জনসেবার মহান উদ্দেশ্যেই গঠন করা হয়েছে। এটি ক্ষমতা প্রদর্শনের কোনো বাহিনী নয়, বরং জনগণের নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় অঙ্গ। তাই পুলিশের অস্তিত্বের কেন্দ্রে থাকা উচিত জনসেবা, দমননীতি নয়; আস্থা, ভয় নয়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ নামটি উচ্চারিত হলেই জনগণের একাংশের মধ্যে আস্থা নয়, বরং সংশয়, ভয় বা বিদ্রুপের অনুভূতি তৈরি হয়। কোনো গণতান্ত্রিক ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের জন্য এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পুলিশের নাম শুনে জনগণ যেন বিদ্রুপের হাসি না হাসে-বরং আস্থা ও নিরাপত্তার অনুভূতি পায়, সেটিই হওয়া উচিত রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য। এই আস্থা কোনো পোশাক পরিবর্তনের মাধ্যমে অর্জিত হয় না; বরং তা অর্জিত হয় ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং মানবিক আচরণের মাধ্যমে।
গত কয়েক বছরে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় পুলিশ বাহিনী নানা বিতর্ক, সমালোচনা এবং সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তবে একটি মৌলিক সত্য উপেক্ষা করা যায় না-রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালনকারী সদস্যরাও এই দেশের নাগরিক। তাদেরও জীবন আছে, পরিবার আছে, মর্যাদা আছে এবং সর্বোপরি ন্যায়বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অন্যায়ের দায় সমগ্র বাহিনীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া যেমন অন্যায্য, তেমনি রাজনৈতিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা, হত্যা, থানায় অগ্নিসংযোগ বা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংসও কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
একইভাবে, পুলিশের কোনো অন্যায় বা ক্ষমতার অপব্যবহারও আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। ন্যায়বিচার একমুখী হতে পারে না; তা সবার জন্য সমান হতে হবে। রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার ভিত্তি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন বিচার ব্যবস্থা নিরপেক্ষভাবে সকলের ক্ষেত্রে সমভাবে কার্যকর হয়।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় দেশ এমন বহু ঘটনার সাক্ষী হয়েছে, যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সহিংসতার শিকার হয়েছেন, প্রাণ হারিয়েছেন এবং বহু প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হয়েছে। এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার যেমন অপরিহার্য, তেমনি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর জবাবদিহিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে কোনো অবস্থাতেই প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করা যায় না; বরং প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করেই রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব।
রাষ্ট্র পরিচালনার পরিণত সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তি বা সরকারের সঙ্গে একাকার করা হয় না। সরকার আসে, সরকার যায়; কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে। তাই পুলিশের পোশাক, প্রতীক বা পরিচয়কে রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের বিষয় বানানো অনাকাঙিক্ষত। বারবার বাহ্যিক পরিবর্তনের মাধ্যমে সংস্কারের ভ্রম তৈরি করা সহজ, কিন্তু একটি পেশাদার, দক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও জনগণমুখী পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা অনেক বেশি কঠিন ও জরুরি কাজ।
আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন হলো পুলিশের রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধ করে তাকে প্রকৃত অর্থে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও পেশাদার প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা। পাশাপাশি সদস্যদের নিরাপত্তা, মর্যাদা, প্রশিক্ষণ, কল্যাণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। কারণ রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রহরীদের শক্তি পোশাকের রঙে নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং জনগণের আস্থায় নিহিত।
অতএব স্পষ্টভাবে বলা যায়, ইউনিফর্ম পরিবর্তন নয়, বরং প্রয়োজন পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা পুনর্গঠন। সেই মর্যাদা গড়ে উঠবে জনগণের আস্থা, ন্যায়বিচার এবং পেশাদার আচরণের মধ্য দিয়ে। পুলিশ যদি সত্যিকার অর্থে জনসেবক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, তবে ইউনিফর্ম নয়-কর্মই হবে তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
সানা/আপ্র/২১/৬/২০২৬