রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন আইনের শাসন কেবল সংবিধানের পাতায় নয়, বাস্তব জীবনের প্রতিটি স্তরে দৃশ্যমান থাকে। কিন্তু যখন চাঁদাবাজি, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, অপহরণ ও জিম্মির মতো অপরাধগুলো সামাজিক বাস্তবতায় স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং নাগরিকের নিরাপত্তা ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর একটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে সংঘবদ্ধভাবে চাঁদাবাজির চেষ্টা ও মব সৃষ্টির ঘটনা সেই গভীর সংকটেরই আরেকটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।
একজন চিকিৎসকের প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব খাটিয়ে পণ্য সরবরাহে বাধ্য করার চেষ্টা, অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের অভিযোগ, এবং প্রতিরোধের মুখে সংগঠিতভাবে আতঙ্ক সৃষ্টি-এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং এটি সেই পুরনো দুষ্টচক্রের নতুন রূপ, যেখানে অপরাধীরা দলীয় ছায়া ব্যবহার করে নিজেদের অপ্রতিরোধ্য মনে করে। আরো উদ্বেগজনক হলো, এমন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। যদি রাষ্ট্রের বাহিনীই দ্বিধাগ্রস্ত হয়, তবে সাধারণ মানুষের আশ্রয় কোথায়?
এ বাস্তবতায় চাঁদাবাজদের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক সূচনা। কিন্তু তালিকা তৈরি করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; বরং প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হয় তার পরেই। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, তালিকা বহুবার হয়েছে, অভিযানও হয়েছে-কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব, আপস এবং নির্বাচনী সমীকরণের কাছে অনেক সময় সেই উদ্যোগ থমকে গেছে। এবার সেই পুরনো ভুলের পুনরাবৃত্তি হলে তার দায় এড়ানোর সুযোগ থাকবে না।
এখানেই বর্তমান সরকারের প্রতি, বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এবং এর চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি প্রত্যাশা সবচেয়ে বেশি। কারণ, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রতিপক্ষকে চাঁদাবাজির অভিযোগে আক্রমণ করে জনমত গঠনের যে প্রবণতা দেখা গেছে, তা এখন একটি নৈতিক দায়ে পরিণত হয়েছে। জনগণ জানতে চায়-যে ভাষণে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে এত দৃঢ় অবস্থানের কথা বলা হয়েছিল, ক্ষমতায় এসে তা কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে?
রাষ্ট্র পরিচালনা কেবল প্রতিশ্রুতির বিষয় নয়; এটি সাহসিকতার পরীক্ষা। এই সাহস দেখাতে হবে নিজেদের ভেতর থেকেও। যদি দলীয় পরিচয়ের আড়ালে থাকা অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করা হয়, তবে সেই ব্যর্থতা কেবল প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতারও অবক্ষয় ডেকে আনবে। আইন যদি সবার জন্য সমান না হয়, তবে সেটি আইন নয়-ক্ষমতার হাতিয়ার মাত্র।
মব সংস্কৃতি এই সংকটকে আরো ভয়াবহ করে তোলে। এটি আইনের শাসনের সরাসরি অস্বীকৃতি। যখন কিছু মানুষ দলবদ্ধ হয়ে বিচারক, শাস্তিদাতা ও নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন রাষ্ট্রের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়ে। এই সংস্কৃতিকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া মানে ভবিষ্যতের জন্য আরো বড় অরাজকতার দরজা খুলে দেওয়া।
অতএব, এখন প্রয়োজন আপসহীন ও নিরপেক্ষ অবস্থান। অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই হবে বিচার্য-এই নীতিকে কার্যকর করতে হবে দৃশ্যমানভাবে। দ্রুত বিচার, কঠোর শাস্তি এবং রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের সম্পূর্ণ অবসান-এই তিনটিই হতে পারে কার্যকর সমাধানের ভিত্তি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি এই মুহূর্তে দেশের মানুষের প্রত্যাশা একটাই-তিনি যেন প্রমাণ করেন, রাষ্ট্র তার নিজস্ব শক্তিতে পরিচালিত হয়, কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তির ইচ্ছায় নয়। চাঁদাবাজি ও মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স কেবল ঘোষণা নয়, বাস্তবতায় রূপ নিক-এই প্রত্যাশাই আজ সবচেয়ে বড়।
কারণ, দুষ্টচক্র ভাঙতে দেরি হলে, সেই দুষ্টচক্রই একসময় রাষ্ট্রকে গ্রাস করে।
সানা/আপ্র/১৩/৪/২০২৬