একটি সভ্য রাষ্ট্রের মানদণ্ড নির্ধারিত হয় তার সবচেয়ে দুর্বল ও অসহায় নাগরিকদের নিরাপত্তা দিয়ে। সেই বিবেচনায় শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল রাষ্ট্রের একটি দায়িত্ব নয়, বরং এটি একটি জাতির মানবিক বিবেকের পরীক্ষা। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নৃশংস সহিংসতা, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাগুলো আমাদের সেই পরীক্ষার সামনে কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে।
রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারের নির্মম হত্যাকাণ্ড সমগ্র জাতিকে স্তম্ভিত ও শোকাহত করেছে। যে বয়সে একটি শিশুর পৃথিবী হওয়ার কথা স্বপ্ন, খেলা আর নির্ভাবনার; সেই বয়সেই তাকে হতে হয়েছে পাশবিকতার শিকার। এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের অসীম বেদনার কারণ নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্যও গভীর আত্মসমালোচনার বিষয়। কারণ প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়া।
এমন বাস্তবতায় জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের উদ্বেগ এবং শিশু সুরক্ষায় প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদারের আহ্বান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সংস্থাটির বাংলাদেশ প্রতিনিধি যথার্থভাবেই বলেছেন, অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। প্রকৃতপক্ষে দীর্ঘদিন ধরে বিচারহীনতা, সামাজিক নীরবতা এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতা অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীদের সাহস জুগিয়েছে। ফলে কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু গ্রেফতার বা বিচার নয়, প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও টেকসই প্রতিরোধ কাঠামো।
শিশু নির্যাতন প্রতিরোধকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একক দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ-সবার সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে। একটি শিশুর আচরণগত পরিবর্তন, মানসিক অস্থিরতা কিংবা সম্ভাব্য ঝুঁকির লক্ষণ শনাক্ত করার মতো সচেতনতা পরিবার ও সমাজে গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, আবাসিক প্রতিষ্ঠান, শিশুযত্ন কেন্দ্র এবং কর্মক্ষেত্রগুলোকে আরো নিরাপদ ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশে রূপান্তর করতে হবে।
বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে শিশুবান্ধব বিচারব্যবস্থা ও মনোসামাজিক সহায়তার ওপর। নির্যাতনের শিকার শিশু ও তার পরিবারকে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া, সামাজিক কলঙ্ক কিংবা মানসিক যন্ত্রণার মুখে একা ফেলে রাখা যায় না। তাদের জন্য প্রয়োজন দ্রুত সহায়তা, নিরাপদ আশ্রয়, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা।
এ ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে দায়িত্বশীলতাও অত্যন্ত জরুরি। ভুক্তভোগী শিশু কিংবা তার পরিবারের ছবি, ভিডিও বা ব্যক্তিগত তথ্য প্রচার করা মানবিকতা ও আইনের পরিপন্থী। এটি এক ধরনের দ্বিতীয় দফা নির্যাতন, যা তাদের ক্ষতকে আরো গভীর করে। অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন, কিন্তু ভুক্তভোগীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে নয়।
শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ কোনো সাধারণ আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি জাতির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রশ্ন। তাই প্রয়োজন কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা, নৈতিক শিক্ষা, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং প্রতিরোধমূলক সুরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকর সমন্বয়।
রামিসার করুণ মৃত্যু যেন আরেকটি পরিসংখ্যান হয়ে না যায়। এই বেদনা থেকে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার যদি নতুন করে দায়িত্ববোধের শিক্ষা গ্রহণ করে, তবেই তার আত্মত্যাগ অর্থবহ হবে। প্রতিটি শিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা আজ কেবল একটি দাবি নয়, এটি জাতির প্রতি জাতিরই অঙ্গীকার। শিশু সুরক্ষায় আর কোনো বিলম্বের সুযোগ নেই।
সানা/আপ্র/২৫/৫/২০২৬