শান্ত-মারিয়াম ফাউন্ডেশন, শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি ও সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস প্রাইভেট লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ইমামুল কবীর শান্তর ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ শনিবার (৩০ মে)।
মহামারি করোনায় আক্রান্ত হয়ে ২০২০ সালের এই দিনে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন দেশের এই কৃতি সন্তান। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রাজধানীর বনানী কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর।
১৯৫৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার নাখালপাড়ার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মো. ইমামুল কবীর শান্ত। তাঁদের আদি নিবাস খুলনা।
মুক্তিযুদ্ধ থেকে সমাজ গঠনের অনন্য অভিযাত্রা
মাত্র ১৭ বছর বয়সে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ ও মানবকল্যাণের যে যাত্রা মো. ইমামুল কবীর শান্ত শুরু করেছিলেন, তা পরবর্তী সময়ে শিক্ষা-সংস্কৃতি-প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান ও সমাজ উন্নয়নের বিস্তৃত কর্মযজ্ঞে রূপ নেয়। যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে তিনি বিশ্বাস করেছিলেন-স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানভিত্তিক মুক্তিতে সহায়ক হয়।
এই বিশ্বাস থেকেই স্বাধীনতা-পরবর্তী অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল বাংলাদেশে কর্মমুখী ও সৃজনশীল শিক্ষার প্রসারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। একে একে গড়ে তোলেন শান্ত-মারিয়াম ফাউন্ডেশন, শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, শান্ত-মারিয়াম একাডেমি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, শান্ত-মারিয়াম ইনস্টিটিউট অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, শান্ত-মারিয়াম স্কুল অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, শিশু ও বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র শান্তনিবাস, সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস প্রাইভেট লিমিটেড এবং দৈনিক আজকের প্রত্যাশাসহ বিভিন্ন শিক্ষা, সামাজিক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান।
এসব প্রতিষ্ঠানকে স্থায়ী ও টেকসই ভিত্তির উপর দাঁড় করানোর জন্য প্রথমেই প্রতিষ্ঠা করেন আয়মুখী অথচ মানুষের সেবায় নিয়োজিত দেশের প্রথম কুরিয়ার সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস প্রাইভেট লিমিটেড। যা দেশের কুরিয়ার খাতে সংগঠিত কাঠামো গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একজন সফল উদ্যোক্তা, শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক হিসেবে ইমামুল কবীর শান্ত বিশ্বাস করতেন-শিক্ষাই পারে একটি জাতিকে আত্মনির্ভরশীল ও মানবিক শক্তিতে রূপান্তর করতে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা বিস্তার এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকে তিনি জীবনের অন্যতম লক্ষ্য ও আরাধনা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
তাঁর স্বপ্ন ছিল একটি দক্ষ, সৃজনশীল ও কর্মমুখী সমাজ গড়ে তোলা-যেখানে শিক্ষা শুধু ডিগ্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বাস্তব জীবনের সক্ষমতা তৈরি করবে।
ইমামুল কবীর শান্ত বিশ্বাস করতেন, আধুনিক বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবনের কোনো বিকল্প নেই। কর্মমুখী শিক্ষা, সৃজনশীল প্রযুক্তি, সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ-এই চারটি স্তম্ভকে তিনি তাঁর কর্মপরিকল্পনার কেন্দ্রে রেখেছিলেন।
তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু শিক্ষা বা ব্যবসার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং সামাজিক উন্নয়নের একটি বিস্তৃত ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
জীবনভর স্বপ্ন ও দায়বদ্ধতার পথচলা
প্রায় পুরো জীবনজুড়েই তিনি যুক্ত ছিলেন শিক্ষা সম্প্রসারণ, সেবামূলক কার্যক্রম এবং সাংগঠনিক উন্নয়নের কাজে। তাঁর ভাবনায় ছিল-মানুষের উন্নয়নই প্রকৃত উন্নয়ন। তাই তিনি একইসঙ্গে উদ্যোক্তা, শিক্ষানুরাগী এবং সমাজনির্মাতা হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন।
প্রতি বছরের মতো নানা কর্মসূচি
প্রতি বছরের মতো এবারো তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে শান্ত-মারিয়াম ফাউন্ডেশন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে। আজ সকালে বনানী কবরস্থানে জিয়ারতের মধ্য দিয়ে শুরু করে কর্মসূচির মধ্যে আরো রয়েছে- কোরআনখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, রক্তদান কর্মসূচি, অসহায় ও দুস্থ মানুষের মাঝে খাবার বিতরণ এবং স্মরণসভা। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায় দেশবাসীর কাছে দোয়া চাওয়া হয়েছে।
চিরন্তন প্রেরণার নাম ইমামুল কবীর শান্ত
মুক্তিযুদ্ধের কিশোর যোদ্ধা থেকে শুরু করে একজন সফল সমাজনির্মাতা-ইমামুল কবীর শান্তর জীবন শুধু একটি ব্যক্তিগত অর্জনের গল্প নয়, বরং একটি প্রজন্মের জন্য প্রেরণার ইতিহাস। তাঁর তৈরি প্রতিষ্ঠান ও ভাবনা আজও শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবকল্যাণের পথে এগিয়ে চলার শক্তি জোগায়।
সানা/আপ্র/৩০/৫/২০২৬