রাষ্ট্র কেবল একটি ভূখণ্ডের নাম নয়; রাষ্ট্র মানে মানুষের স্বপ্ন, বিশ্বাস, স্মৃতি, অনুভূতি এবং ভবিষ্যতের সম্মিলিত ঠিকানা। সেই ঠিকানার ভেতর যখন অবিশ্বাসের ছায়া ঘনীভূত হয়, যখন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমশ বিদ্বেষে রূপ নেয়, যখন বক্তব্যের ভাষা শালীনতার সীমা অতিক্রম করে শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু কোনো দল বা ব্যক্তি নয়-আহত হয় পুরো জাতির আত্মা।
বাংলাদেশ আজ এমনই এক সময় অতিক্রম করছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাত, আন্দোলন, পাল্টা আন্দোলন, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং সামাজিক বিভাজনের অভিঘাতে মানুষের মনোজগৎ ক্লান্ত। একদিকে রয়েছে পরিবর্তনের আকাঙক্ষা, অন্যদিকে রয়েছে সেই পরিবর্তনের পথ ও পদ্ধতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ। এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো-আমরা কি সত্যিই একটি সভ্য, সহনশীল ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে এগোচ্ছি, নাকি আবারো সংঘাতের পুরোনো অন্ধগলিতে ফিরে যাচ্ছি?
২০২৪ সালের আন্দোলন দেশের তরুণ প্রজন্মকে নতুন আশার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। প্রবীণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা ও দীর্ঘদিনের হতাশার প্রেক্ষাপটে মানুষ বিশ্বাস করেছিল, তরুণদের হাত ধরে হয়তো বাংলাদেশ নতুন রাজনৈতিক নৈতিকতা, নতুন সংস্কৃতি এবং নতুন গণতান্ত্রিক চর্চার দিকে অগ্রসর হবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় সেই স্বপ্নের আকাশে মেঘ জমেছে। মব সংস্কৃতি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি অসহিষ্ণুতা, উসকানিমূলক বক্তব্য এবং শক্তি প্রদর্শনের প্রবণতা মানুষের মনে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে-পরিবর্তন কি কেবল মুখের ভাষায়, নাকি আচরণের মধ্যেও তার প্রতিফলন রয়েছে?
সাম্প্রতিক সময়ে ঝিনাইদহে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার ঘটনা নিঃসন্দেহে নিন্দনীয়। গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক সহিংসতার কোনো স্থান নেই। অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ হওয়া উচিত। কিন্তু একই সঙ্গে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় কিছু নেতার বক্তব্যে যে সংঘাতমুখী ভাষা উচ্চারিত হয়েছে, তা রাজনৈতিক পরিবেশকে আরো উত্তপ্ত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে। সহিংসতার প্রতিবাদ করতে গিয়ে যদি সহিংসতারই সম্ভাবনা উচ্চারিত হয়, তবে তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না; বরং দুর্বল করে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর বক্তব্য, আচরণ এবং রাজনৈতিক বার্তায় তুলনামূলক সংযম ও সতর্কতার পরিচয় দিচ্ছেন। তিনি তাঁর দলের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও নেতাকর্মীদের আক্রমণাত্মক বক্তব্য এবং উসকানিমূলক আচরণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন। এই অবস্থান গণতান্ত্রিক শুদ্ধাচারের একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা একটি দলের কাছ থেকে এমন সংযত আচরণ প্রত্যাশিতও বটে। কিন্তু একই সময়ে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির কিছু বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে প্রশ্ন সৃষ্টি হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। কারণ গণতন্ত্রে নৈতিক উচ্চতা অর্জিত হয় কণ্ঠের উচ্চতায় নয়, আচরণের মহত্ত্বে।
বাংলাদেশের মানুষ আর সংঘাতের রাজনীতি চায় না। তারা এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ চায়, যেখানে প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, প্রতিযোগী হিসেবে দেখা হবে; যেখানে যুক্তির লড়াই হবে, ঘৃণার নয়; যেখানে ভিন্নমত থাকবে, বিদ্বেষ থাকবে না। কারণ ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা হলো-যে রাজনীতি ক্রোধকে পুঁজি করে, সে সাময়িকভাবে জনতাকে উত্তেজিত করতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে জাতিকে বিভক্ত করে। আর যে রাজনীতি সহমর্মিতা, শালীনতা ও দায়িত্ববোধকে ধারণ করে, সেই রাজনীতিই রাষ্ট্রকে স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির পথে নিয়ে যায়।
আজ বাংলাদেশের হৃদয় যেন বহু আঘাতে বিদীর্ণ। এই হৃদয়কে আরো রক্তাক্ত করার নয়, আরোগ্য দেওয়ার সময় এসেছে। ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল, তরুণ নেতৃত্ব, প্রবীণ রাজনীতিক-সবার সামনে এখন একটিই ঐতিহাসিক দায়িত্ব: বিভাজনের দেয়াল নয়, আস্থার সেতু নির্মাণ করা। কারণ রাজনৈতিক বিজয়ের চেয়েও বড় হলো রাষ্ট্রের স্থিতি, দলের স্বার্থের চেয়েও বড় হলো জাতির ভবিষ্যৎ।
এই প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন কিছু জরুরি পদক্ষেপ-
১. সব রাজনৈতিক দলের জন্য আচরণবিধি প্রণয়ন ও কঠোর অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে।
২. সহিংসতা, মব সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দলনিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করতে হবে।
৩. রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যে শালীনতা ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে নিয়মিত সংলাপের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
৫. তরুণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা ও রাষ্ট্রচিন্তাভিত্তিক প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে।
৬. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে সবার জন্য সমান আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
আমাদের প্রত্যাশা -সংঘাতের আগুনে নয়, সৌহার্দ্যের আলোয় রচিত হোক বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। রাজনীতির ভাষা হোক মার্জিত, নেতৃত্ব হোক দায়িত্বশীল, আর গণতন্ত্র হোক এমন এক মহৎ চর্চা-যেখানে প্রতিটি নাগরিক নিজেকে নিরাপদ, সম্মানিত ও আশাবাদী মনে করতে পারে। কারণ একটি ভাঙা হৃদয়ের জাতির সবচেয়ে বড় প্রয়োজন প্রতিশোধ নয়, পুনর্মিলন; শত্রুতা নয়, সহমর্মিতা; বিভাজন নয়, মানবিক ও সুন্দর রাজনীতির পুনর্জন্ম।
সানা/আপ্র/২৪/৫/২০২৬