ভাত শুধু খাদ্য নয়-এটি বেঁচে থাকার অধিকার, একটি পরিবারের নিশ্চিন্ত নিঃশ্বাস, ক্ষুধার বিরুদ্ধে মানুষের সবচেয়ে প্রাচীন ও মৌলিক লড়াইয়ের প্রতীক। তাই যখন রাষ্ট্র ১৫ টাকা কেজি দরে চাল দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, তখন তা নিছক একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত থাকে না; হয়ে ওঠে এক গভীর মানবিক অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার জড়িয়ে থাকে সেইসব মানুষের সঙ্গে, যাদের কাছে প্রতিটি দানা ভাত মানে একটি নতুন দিনের সম্ভাবনা।
সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ৫৫ লাখ পরিবারকে বছরে ছয় মাস ৩০ কেজি করে চাল দেওয়ার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। যা কেবল একটি ঘোষণা নয়; কোটি হতদরিদ্র মানুষের চোখের আশার আলো। কিন্তু এই আলো কতটা তাদের ঘরে পৌঁছাবে, আর কতটা পথেই নিভে যাবে-এমন প্রশ্ন আর শঙ্কা থেকেই যায়। এই চাল কি সত্যিই পৌঁছাবে সেই মানুষের কাছে, যাদের জন্য এটি বরাদ্দ? নাকি পথেই হারিয়ে যাবে অনিয়ম, দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতির অন্ধকার গলিতে?
অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের আশাবাদী হতে দেয় না। বহু ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, প্রকৃত হতদরিদ্র মানুষ তালিকার বাইরে থেকে যায়, আর সুবিধাভোগীর তালিকায় ঢুকে পড়ে প্রভাবশালী কিংবা রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো-এই প্রক্রিয়ায় অনেক সময় দলীয় পরিচয়ই হয়ে ওঠে প্রধান মানদণ্ড। অথচ বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্রের কাছে সব নাগরিক সমান। সব দল-মত নির্বিশেষে জনগণ সরকারেরই-কেউ ক্ষমতাসীন দলের, কেউ বিরোধী দলের, আবার কেউ কোনো দলেরই নয়; কিন্তু সবাই এই দেশেরই মানুষ, একই রাষ্ট্রের নাগরিক।
এখানেই সবচেয়ে বড় সতর্কতা জরুরি। সরকারি দলের নেতাকর্মীরা যেন মুখ চিনে বা দল চিনে উপকারভোগী নির্ধারণ না করেন। দরিদ্রের কোনো দল নেই, ক্ষুধার কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। যে মানুষটি অভাবে দিন কাটাচ্ছে, সে যেই দলের সমর্থক হোক না কেন-তার অধিকার সমানভাবে নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এই ন্যায়বোধ যদি হারিয়ে যায়, তবে পুরো কর্মসূচির মানবিক ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো বরাদ্দ চালের অপব্যবহার। বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, দরিদ্রের জন্য বরাদ্দ চাল খোলাবাজারে বিক্রি হয়ে যায়। এতে একদিকে দরিদ্র মানুষ বঞ্চিত হয়, অন্যদিকে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। যারা এই কাজের সঙ্গে জড়িত-হোক তারা অসাধু ডিলার, রাজনৈতিক নেতা বা ব্যবসায়ী-তারা শুধু আইন ভঙ্গ করে না; তারা একজন ক্ষুধার্ত মানুষের মুখের ভাত কেড়ে নেয়। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
এই কর্মসূচিকে সফল করতে হলে প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছতা। ডিজিটাল উপকারভোগী তালিকা, স্মার্ট কার্ড বা কুপন ব্যবস্থা চালু করা গেলে অনিয়ম অনেকটাই কমানো সম্ভব। পাশাপাশি প্রতিটি বিতরণ কেন্দ্রকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যম এবং সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত তদারকি ছাড়া এই বিশাল কর্মসূচি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন।
সবচেয়ে বড় কথা, এই উদ্যোগকে শুধু একটি সরকারি প্রকল্প হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একটি নৈতিক দায়-যেখানে প্রতিটি চালের দানা একটি জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। সেই জীবনকে সম্মান জানানোই রাষ্ট্রের প্রকৃত দায়িত্ব।
ক্ষুধার কষ্ট সবচেয়ে নির্মম, কারণ এটি কোনো ভাষা বোঝে না। এটি শুধু পেটের শূন্যতা আর চোখের অসহায়ত্ব দিয়ে কথা বলে। যে মা তার সন্তানের জন্য একমুঠো ভাত জোগাড় করতে পারেন না, তার কাছে ১৫ টাকার চাল কোনো পরিসংখ্যান নয়-এটি বাঁচার শেষ ভরসা। সেই ভরসা যদি অনিয়ম আর দুর্নীতির জালে আটকে যায়, তবে তা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি এক গভীর মানবিক বিপর্যয়।
অতএব, ১৫ টাকার চালের এই উদ্যোগ যেন কেবল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না থাকে; এটি যেন পৌঁছে যায় প্রতিটি প্রকৃত দরিদ্রের ঘরে, তাদের থালায়, তাদের জীবনে। যে চাল বাঁচাবে জীবন, তা কোনোভাবেই লুটের পণ্য হতে পারে না।
সানা/আপ্র/৭/৪/২০২৬