উৎসবের নাম ঈদ, অথচ তার পথরেখায় আঁকা থাকে শোকের কালো ছায়া-এ এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা। প্রতি বছরই আমরা দেখি, ঘরে ফেরার আনন্দ রূপ নেয় না ফেরার বেদনায়। এবারের ঈদযাত্রাও তার ব্যতিক্রম নয়। পরিসংখ্যান বলছে, মাত্র পনেরো দিনে প্রায় চারশ মানুষের প্রাণ ঝরে গেছে সড়কে। এই সংখ্যা কেবল একটি হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার নির্মম প্রতিচ্ছবি, যেখানে প্রতিটি মৃত্যু একেকটি অপ্রতিরোধ্য প্রশ্ন হয়ে ফিরে আসে-এই মৃত্যুমিছিলের শেষ কোথায়?
দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নগণ্য। ইলিয়াস কাঞ্চনের মতো একজন মানুষের ব্যক্তিগত বেদনা থেকে যে সামাজিক চেতনার সূচনা হয়েছিল, তা আজও নীতি নির্ধারণের কেন্দ্রে জায়গা করে নিতে পারেনি। ফলে সড়ক যেন এক অনিয়ন্ত্রিত ক্ষেত্র-যেখানে নিয়ম আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই; আইন আছে, কিন্তু শাস্তি নেই।
এই বাস্তবতায় যখন দায়িত্বশীল মহল ঈদযাত্রাকে “স্বস্তিকর” বলে আখ্যায়িত করে, তখন তা শুধু বিস্ময়ই জাগায় না, বরং গভীর উদ্বেগও সৃষ্টি করে। কারণ, বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। দৌলতদিয়ায় একটি বাস নদীতে ডুবে গিয়ে বহু প্রাণহানির ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়-আমরা এখনও কতটা অনিরাপদ। এমন পরিস্থিতিতে আত্মতুষ্টির ভাষা জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করে এবং সমস্যার মূল কারণগুলোকে আড়াল করে দেয়।
সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলো বহুবার চিহ্নিত হয়েছে। অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত গতি, মহাসড়কে অব্যবস্থাপনা, সঠিক সড়কচিহ্ন ও আলোর অভাব-সব মিলিয়ে একটি বিপজ্জনক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রভাবশালী পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্বল তদারকি ব্যবস্থা। ফলে আইন প্রয়োগ প্রায়শই প্রশ্নবিদ্ধ হয়, আর সাধারণ মানুষ হয়ে পড়ে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ। সড়ক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নিয়ম ভঙ্গের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। দক্ষ চালক তৈরিতে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আলাদা লেন, সঠিক সাইনেজ ও পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবহন খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা না হলে কোনো উদ্যোগই দীর্ঘস্থায়ী ফল দেবে না।
সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। একটি প্রাণের মূল্য যে অপরিমেয়-এই বোধটি রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ক্ষতিপূরণের সামান্য অঙ্ক দিয়ে দায় এড়ানো যায় না; প্রয়োজন দায় স্বীকার এবং তার কার্যকর প্রতিকার।
ঈদের পথ যদি আনন্দের হয়, তবে সেই পথে মৃত্যুর ছায়া থাকা চলতে পারে না। আমাদের সড়ককে জীবনের পথ বানাতে হবে, মৃত্যুর নয়। এই দায় এড়ানোর সুযোগ আর নেই-এখনই সময়, নীতি ও বাস্তবতার মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তোলার।
সানা/আপ্র/১/৪/২০২৬