‘তোমরা ফুটবল খেললে গীতা পড়ার চেয়ে স্বর্গের কাছাকাছি যাবে’-স্বামী বিবেকানন্দ যুবকদের উদ্দেশে এমন বক্তব্য রেখেছিলেন। যার মাধ্যমে তিনি শারীরিক শক্তির অপরিহার্যতা তুলে ধরেন।
শত বছর আগে স্বামীজী যে সত্য উচ্চারণ করেছিলেন, তা আজকের বাস্তবতায় আরো তীব্রভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি বুঝিয়েছিলেন, দুর্বল শরীর নিয়ে জ্ঞান, ধর্ম বা আদর্শের গভীরে পৌঁছানো যায় না; সুস্থতা ও শক্তিই সব উন্নতির প্রথম শর্ত।
অবশ্য আজ আমরা এক বিপরীত বাস্তবতার মুখোমুখি। খেলাধুলা ও শরীরচর্চার অভাবে শিশু, কিশোর ও তরুণ প্রজন্ম ক্রমেই শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। নগরকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা মানুষকে করে তুলেছে কায়িক পরিশ্রমবিমুখ, আর প্রযুক্তিনির্ভরতা ও মানসিক চাপ তাদের আটকে ফেলছে এক অদৃশ্য খাঁচায়। এর ফল হিসেবে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ নানা অসংক্রামক রোগ অকালেই গ্রাস করছে জীবনের স্বাভাবিক গতি। যে বয়সে মাঠে ছুটে বেড়ানোর কথা, সে বয়সেই শিশুরা বন্দি হয়ে পড়ছে পর্দার আলোয়-এ এক নীরব বিপর্যয়ে, যার ভবিষ্যৎ গভীরভাবে উদ্বেগজনক।
এই প্রেক্ষাপটে চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করার সরকারি সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। জাতীয় সংসদে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে সাতটি ইভেন্ট দিয়ে শুরু করে পর্যায়ক্রমে আরো খেলাধুলা অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য কেবল ক্রীড়াবিকাশ নয়, বরং একটি প্রজন্মকে প্রযুক্তি আসক্তি থেকে মুক্ত করে মাঠমুখী, সক্রিয় ও প্রাণবন্ত করে তোলা।
তবে বাস্তবতা হলো-নীতিগত সিদ্ধান্ত যতই ইতিবাচক হোক, তার কার্যকর বাস্তবায়নই আসল চ্যালেঞ্জ। আজ দেশের অধিকাংশ শহরে খেলার মাঠের চরম সংকট বিদ্যমান। অবাধ নগরায়ণ ও পরিকল্পনার অভাবে শিশুদের জন্য উন্মুক্ত মাঠ ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। তাই শুধু শিক্ষাক্রমে খেলাধুলা অন্তর্ভুক্ত করলেই হবে না; প্রয়োজন সারাদেশে-শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত-পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নির্মাণ ও সংরক্ষণ। প্রতিটি শিশুর জন্য একটি নিরাপদ ও সহজলভ্য খেলার পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
একই সঙ্গে ক্রীড়াঙ্গনকে দলীয়করণ ও রাজনীতিকরণের কবল থেকে মুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। প্রতিমন্ত্রী সংসদে স্বীকার করেছেন, অতীতে ক্রীড়া সংস্থাগুলোতে অনিয়ম, দুর্নীতি ও দলীয় প্রভাব বিস্তার পেয়েছিল। এমনকি ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানের সম্পদ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে তদন্ত ও জবাবদিহির উদ্যোগ কেবল প্রয়োজনীয়ই নয়, বরং একটি সুস্থ ক্রীড়া সংস্কৃতি পুনর্গঠনের পূর্বশর্ত। মেধা, সততা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে ক্রীড়াব্যবস্থা গড়ে না তুললে কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না।
সরকার খেলোয়াড় তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে-এটি অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু মনে রাখতে হবে, প্রতিটি বড় খেলোয়াড়ের জন্ম হয় ছোট একটি মাঠে, শৈশবের খেলায়। সেই মাঠ যদি না থাকে, তবে প্রতিভার বিকাশও থেমে যাবে। তাই অবকাঠামো উন্নয়ন ও মানবসম্পদ তৈরির মধ্যে সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি।
আজকের এই সিদ্ধান্ত কেবল একটি নীতিগত পরিবর্তন নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের সূচনা হতে পারে। যদি আমরা সত্যিই সুস্থ, সচেতন ও শক্তিশালী প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই, তবে খেলাধুলাকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুলতেই হবে।
কারণ, সুস্থ শরীরের ভেতরেই বাস করে সুস্থ মন, আর সুস্থ মনই গড়ে তোলে একটি শক্তিশালী জাতি।
সানা/আপ্র/৩১/৩/২০২৬