গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬

মেনু

মতের স্বাধীনতা বনাম ট্যাগের সন্ত্রাস জরুরি প্রতিকার দরকার

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৩:১৫ পিএম, ১১ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ১৫:০১ এএম ২০২৬
মতের স্বাধীনতা বনাম ট্যাগের সন্ত্রাস জরুরি প্রতিকার দরকার
ছবি

ছবি সংগৃহীত

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তিমূল যে কটি নীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তার মধ্যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক মতাদর্শ ধারণের অধিকার অন্যতম। বাংলাদেশের সংবিধানও নাগরিককে যে মৌলিক অধিকারগুলোর নিশ্চয়তা দেয়, তার মধ্যে অন্যতম মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা এবং নিজের পছন্দমতো রাজনৈতিক মতাদর্শ ধারণের অধিকার।

নাগরিক যদি নিজের পছন্দমতো রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করতে না পারে, কিংবা কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের সন্দেহেই নির্যাতনের শিকার হয়, তবে সেই রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চেহারা গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। কারণ গণতন্ত্রের শক্তি মতের বৈচিত্র্যে, সহিষ্ণুতায় এবং আইনের শাসনে-ভয় বা প্রতিশোধে নয়।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর এক শিক্ষার্থীকে ‘ছাত্রলীগ সন্দেহে’ কয়েক দফা মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ নামে যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, তা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অভিযোগ অনুযায়ী, দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী রাহিদ খান পাভেলকে সেহরির সময় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-এর একটি হলে কয়েকজন শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় ধরে মারধর করে এবং পরে তাকে শাহবাগ থানায় সোপর্দ করা হয়। ভুক্তভোগীর দাবি-তিনি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নন; অথচ তাকে ‘ছাত্রলীগ’ আখ্যা দিয়েই নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।

ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন অবশ্যই তদন্তের মাধ্যমে হওয়া উচিত। কিন্তু এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো -কেন আমাদের শিক্ষাঙ্গনে এমন এক বিপজ্জনক সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে, যেখানে একটি ‘রাজনৈতিক ট্যাগ’ই হয়ে উঠছে শাস্তি দেওয়ার অজুহাত?

বিশ্ববিদ্যালয় সব সমাজেই জ্ঞানচর্চা, মুক্তবুদ্ধি এবং রাজনৈতিক সচেতনতার অন্যতম কেন্দ্র। এখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, বিতর্ক থাকবে, রাজনৈতিক আলোচনা থাকবে-এটাই স্বাভাবিক। বরং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেই তরুণেরা রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতির নানা প্রশ্ন নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তা করে। কিন্তু সেই শিক্ষাঙ্গন যদি ‘ট্যাগের রাজনীতি’ এবং ‘মব বিচার’-এর সংস্কৃতিতে আক্রান্ত হয়, তাহলে তা কেবল শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশকেই নষ্ট করে না; বরং পুরো দেশ ও সমাজের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকেই বিপন্ন করে তোলে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক সহিংসতার বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। বিশেষভাবে স্মরণীয় ২০১৯ সালে আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড, যা ঘটেছিল এই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়েই। পরবর্তীতে এটি পরিচিত হয় ‘আবরার ফাহাদ মার্ডার’ নামে-একটি ঘটনা, যা পুরো জাতিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তখন সারা দেশ থেকে দাবি উঠেছিল শিক্ষাঙ্গনে সহিংস রাজনীতির অবসান ঘটানোর।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাস্তবতা- ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে সহিংসতার লক্ষ্যবস্তু বদলালেও সহিংসতার সংস্কৃতি বিলীন হয়নি। বরং ২০২৪-এর সরকার পতনের পর তা বেপরোয়া গতি পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন জায়গায় ‘আওয়ামী লীগ ট্যাগ’ বা ‘ছাত্রলীগ সন্দেহ’ দেখিয়ে মানুষকে হেনস্তা, মারধর বা পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠছে। এই প্রবণতা কোনোভাবেই আইনের শাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; বরং এটি মধ্যযুগীয় মব সংস্কৃতিরই প্রতিফলন।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার বিচার হবে আইনের মাধ্যমে। রাষ্ট্রের আইন, আদালত এবং প্রশাসন রয়েছে সেই কাজের জন্য। ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেরাই যদি ‘বিচারক’ হয়ে ওঠে এবং সন্দেহের ভিত্তিতে শাস্তি দিতে শুরু করে, তাহলে সেটি আইনের শাসনের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।

এখানেই রাষ্ট্র ও সরকারের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বহুদলীয় গণতন্ত্রের নীতি ধারণকারী রাজনৈতিক শক্তি-বিশেষ বিএনপি-এর মতো দল-যখন রাজনৈতিক নেতৃত্বে থাকে, তখন তাদের কাছ থেকে নাগরিক অধিকার রক্ষায় আরো দৃঢ় অবস্থান প্রত্যাশা করা স্বাভাবিক। কারণ গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি তখনই প্রমাণিত হয়, যখন ভিন্ন মতের মানুষও নিরাপদ বোধ করে।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেবল একটি সাংবিধানিক শব্দ নয়; এটি একটি সভ্য সমাজের আত্মা। সেই স্বাধীনতাকে যদি ‘ট্যাগের সন্ত্রাস’ দিয়ে দমিয়ে রাখা হয়, তাহলে তা কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকেই নয়, শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজকেই বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। আজ যে সংস্কৃতি অন্যের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে, কাল সেটিই অন্য কারো বিরুদ্ধে ফিরে আসতে পারে।

এই বাস্তবতায় প্রয়োজন দ্রুত ও কার্যকর প্রতিকার। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সরকারের উচিত পরিষ্কার বার্তা দেওয়া-কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া চলবে না। শিক্ষাঙ্গনে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সহিংসতা বা মব বিচার নয়।

কারণ গণতন্ত্র টিকে থাকে সহনশীলতা ও ন্যায়ের ওপর; ভয়, প্রতিহিংসা বা ট্যাগের সন্ত্রাসের ওপর নয়। আজ যদি এই বিপজ্জনক সংস্কৃতিকে থামানো না যায়, তবে একদিন সেই সন্ত্রাসই আমাদের গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেবে। তাই সময়ের দাবি-মতের স্বাধীনতাকে রক্ষা করা এবং ট্যাগের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রতিকার নিশ্চিত করা।

সানা/এসি/১১/০৩/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

খালেদা জিয়া: অদম্য এক নারী, এক যুগের প্রেরণা
১০ মার্চ ২০২৬

খালেদা জিয়া: অদম্য এক নারী, এক যুগের প্রেরণা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের জীবন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; বরং একট...

ভোটে নারী, প্রচারে নারী-প্রার্থী তালিকায় কেন নয়?
০৯ মার্চ ২০২৬

ভোটে নারী, প্রচারে নারী-প্রার্থী তালিকায় কেন নয়?

৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। বিশ্বজুড়ে এই দিনটি নারীর অধিকার, মর্যাদা ও সমতার প্রশ্নকে সামনে আনে।...

রুখতে হবে তেলের বাজারের নৈরাজ্য
০৮ মার্চ ২০২৬

রুখতে হবে তেলের বাজারের নৈরাজ্য

জ্বালানি থেকে ভোজ্য

৭ মার্চকে ঘিরে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন
০৭ মার্চ ২০২৬

৭ মার্চকে ঘিরে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন

ইতিহাসের প্রশ্নে দ্বন্দ্ব নয়

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই