মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যখন ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্রের ছায়া ঘনিয়ে উঠছে, তখন যুদ্ধের আগুন কেবল রাষ্ট্রের সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকে না-তা ছড়িয়ে পড়ে প্রবাসীদের ঘর, কর্মস্থল ও জীবনের নিরাপত্তায়। ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা এবং পাল্টা আঘাতে গোটা উপসাগরীয় অঞ্চল কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন-যা আন্তর্জাতিক আইন ও প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক রীতির প্রশ্নে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এ হত্যাকাণ্ডে মর্মাহত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সংযম ও সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে-এটি সময়োচিত ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ।
এই সংকটের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো-মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত লক্ষ লক্ষ প্রবাসী বাংলাদেশির অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ইতোমধ্যে দুই বাংলাদেশির মৃত্যু এবং সাতজনের আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে প্রাণহানির ঘটনা আমাদের শোকাহত করেছে। কুয়েতে আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে দূতাবাসের তৎপরতা প্রশংসনীয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন-এর জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ জেবেল আলি বন্দরে আটকে পড়লেও ৩১ নাবিক নিরাপদ আছেন-এ তথ্য স্বস্তিদায়ক। সংকটকালে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সরাসরি যোগাযোগ ও সহমর্মিতা রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধেরই বহিঃপ্রকাশ।
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চারদিনে প্রায় দেড়শ ফ্লাইট বাতিল হওয়া কেবল ভ্রমণ-ব্যবস্থার বিঘ্ন নয়; এটি বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রতিফলন। কুয়েত এয়ারওয়েজ, এমিরেটস, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসসহ বিভিন্ন এয়ারলাইনসের ফ্লাইট স্থগিত হওয়ায় হাজারো যাত্রী বিপাকে পড়েছেন। ভিসার মেয়াদ, কর্মস্থলে যোগদানের সময়সীমা ও আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তাদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের নেতৃত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়-যাত্রীদের অস্থায়ী আবাসন, ভিসা-জটিলতা সমাধান ও তথ্য-হালনাগাদের উদ্যোগ-‘নাম্বার ওয়ান প্রায়োরিটি’ হিসেবে নাগরিক-নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দেওয়ারই প্রতিফলন।
দেশের ভেতরেও উত্তেজনার প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে। ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ ঢাকায় বিক্ষোভ করেছে; আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে যুদ্ধ বন্ধের দাবি জানিয়েছে। গণতান্ত্রিক সমাজে প্রতিবাদ-প্রকাশের অধিকার আছে; তবে তা যেন সহিংসতা বা উসকানিতে রূপ না নেয়-রাষ্ট্রকে সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের জাতীয় স্বার্থ স্পষ্ট: আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি আনুগত্য এবং প্রবাসীদের নিরাপত্তা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার শুরু থেকেই কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করেছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দূতাবাসের সঙ্গে বৈঠক, প্রবাসীদের হটলাইন-সেবা সক্রিয়করণ, এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতি-এসব উদ্যোগ অব্যাহত ও আরো গতিশীল হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে জাতিসংঘ ও আঞ্চলিক ফোরামে সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে যুদ্ধবিরতির পক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান জোরালো করতে হবে।
আমাদের ছয় মিলিয়নেরও বেশি প্রবাসী মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করেন; তাঁদের রেমিট্যান্স জাতীয় অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু যুদ্ধের মধ্যে কাজ বড় হতে পারে না-প্রথমে জীবন, পরে জীবিকা। সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে খাদ্য, জ্বালানি ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাপ বাড়তে পারে-অতএব বিকল্প বাজার অনুসন্ধান, শ্রম-চুক্তির বৈচিত্র্যকরণ এবং জরুরি সহায়তা তহবিল গঠন এখন সময়ের দাবি।
ইতিহাস বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি দ্রুত বদলায়। তাই আমাদের নীতিও হতে হবে দ্রুত, নমনীয় ও মানবিক। যুদ্ধের ডামাডোলে বাংলাদেশির জীবন যেন অনিশ্চয়তার অতলে না তলিয়ে যায়-এ দায়িত্ব রাষ্ট্রের, সমাজের এবং কূটনীতির। সংলাপই একমাত্র পথ; সংযমই একমাত্র প্রজ্ঞা। জীবন রক্ষাকে সর্বাগ্রে রেখে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করার এখনই সময়।
সানা/এসি/০৪/০৩/২০২৬