গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

মেনু

চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ প্রয়োজন

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৭:৪৯ পিএম, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ১৮:২১ এএম ২০২৬
চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ প্রয়োজন
ছবি

প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশে চাঁদাবাজি কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাধি। রাজনৈতিক পালাবদল হয়েছে, সরকার বদলেছে, কিন্তু চাঁদাবাজির রূপ বদলালেও দাপট কমেনি। বরং সদ্যসমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এ ইস্যুই বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের ভেতরেও একটি সত্য স্পষ্ট: জনজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশ চাঁদাবাজির চাপে বিপর্যস্ত।

সম্প্রতি ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) যে সতর্কবার্তা দিয়েছে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তাদের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চাঁদাবাজি ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। সংগঠনটির সভাপতি তাসকীন আহমেদ প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন-চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হতে পারে। এ বক্তব্য কেবল ক্ষোভ নয়; এটি অর্থনীতির নীরব আর্তনাদ।

রাজনৈতিক ব্যর্থতার সুযোগে ইস্যুর উত্থান: চাঁদাবাজি নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এটি রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনী প্রচারণায় চাঁদাবাজিকে বড় ইস্যু করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে আক্রমণ করেছে। তাদের বক্তব্য-রাষ্ট্রক্ষমতার ছত্রছায়ায় চাঁদাবাজির সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। আদর্শগত বিতর্ক সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের একাংশ এ বক্তব্যে সাড়া দিয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দেশ পরিচালনায় থাকলেও উভয় দলই সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আস্থার সংকট কাটাতে পারেনি। ফলে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, দখলদারিত্ব ও মাস্তানির মতো অপরাধ জনমানসে গভীর ক্ষোভ তৈরি করেছে। রাজনৈতিক শূন্যতা বা অনাস্থা যখন তৈরি হয়, তখন এমন ইস্যুই জনমতকে প্রভাবিত করে।

অর্থনীতির ওপর সরাসরি আঘাত: ডিসিসিআইয়ের চার দফা দাবি-আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, অনিচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সহায়তা এবং সহনীয় সুদহার-প্রকৃতপক্ষে অর্থনীতির ন্যূনতম শর্ত।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কারখানায় ঢুকতে, অফিস চালাতে, এমনকি পণ্য পরিবহনে চাঁদা দিতে হচ্ছে। প্রশাসন, পুলিশ ও কর দপ্তরের কিছু অসাধু সদস্যের সংশ্লিষ্টতার কথাও উঠে এসেছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে তা কেবল অপরাধ নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তির প্রতি চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ব্যাংকঋণনির্ভর। উচ্চ সুদহার, ডলারের চাপ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি-এসবের সঙ্গে যদি চাঁদাবাজির অতিরিক্ত ‘অদৃশ্য কর’ যুক্ত হয়, তবে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়, প্রতিযোগিতা কমে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি হিসাব করেন; আইনশৃঙ্খলা অনিশ্চিত হলে তারা পুঁজি সরিয়ে নেন।

পুঁজিবাজার শক্তিশালী করার যে প্রস্তাব ডিসিসিআই দিয়েছে, সেটিও প্রাসঙ্গিক। তবে সুশাসন ছাড়া কোনো কাঠামোগত সংস্কার টেকসই হয় না।

রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে অপরাধ: সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো-যে সরকারই আসুক, কিছু ব্যক্তি নিজেদের ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় দিয়ে চাঁদা তোলে। অর্থাৎ সমস্যাটি দলগত নয়; এটি ক্ষমতার অপব্যবহার ও দণ্ডমুক্তির সংস্কৃতি। রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ না করলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযানও স্থায়ী ফল দেবে না।

নদী থেকে বালু উত্তোলন ঘিরে সংঘর্ষ, বাজার দখল নিয়ে গোলাগুলি-এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এগুলো একটি গভীর সংকটের লক্ষণ। যখন চাঁদাবাজির প্রতিবাদে ব্যবসায়ী ও শ্রমিক রাস্তায় নামেন, তখন বুঝতে হবে পরিস্থিতি সহনীয় সীমা ছাড়িয়েছে।

রাষ্ট্রের সামনে করণীয়:

 ১. দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ অভিযান: রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে চাঁদাবাজদের গ্রেফতার ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
২. প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার: পুলিশ ও রাজস্ব প্রশাসনে জবাবদিহি ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং বাড়াতে হবে, যাতে অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের সুযোগ কমে।
৩. রাজনৈতিক ঐকমত্য: প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম সমঝোতা দরকার-যাতে চাঁদাবাজিকে কেউ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে না এবং দলীয় পরিচয়ে অপরাধীকে রক্ষা করবে না।
৪. ব্যবসায়িক আস্থার পুনর্গঠন: বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে দ্রুত প্রতিকার ব্যবস্থা (গ্রিভ্যান্স রিড্রেসাল সেল) গঠন করা যেতে পারে।

সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে: চাঁদাবাজি কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি গণতন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন। যখন নাগরিক মনে করেন-আইনের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় বড়-তখন রাষ্ট্র দুর্বল হয়। ব্যবসা বন্ধের হুঁশিয়ারি যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও প্রবৃদ্ধি-সবই চাপে পড়বে।

অতএব, এখন প্রয়োজন কঠোর, দৃশ্যমান এবং নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় বার্তা-চাঁদাবাজির কোনো দল নেই, কোনো ছাতা নেই, কোনো ছাড় নেই। অন্যথায় অর্থনীতি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনি রাজনীতির ওপর জনআস্থার সংকট আরো গভীর হবে।

রাষ্ট্র যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে চাঁদাবাজি কেবল নির্বাচনী স্লোগান হয়ে থাকবে না-এটি হয়ে উঠবে বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার প্রধান অন্তরায়।

সানা/এসি/আপ্র/২৫/০২/২০২৬

 

 

 

সংশ্লিষ্ট খবর

বিক্ষোভের দিন ফুরাক, বিকাশের দিন শুরু হোক
২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বিক্ষোভের দিন ফুরাক, বিকাশের দিন শুরু হোক

শিক্ষকের মর্যাদায় শিক্ষার মুক্তি

যেখানে সাংবাদিক নিরাপদ নয়, সেখানে গণতন্ত্রও অনিরাপদ
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

যেখানে সাংবাদিক নিরাপদ নয়, সেখানে গণতন্ত্রও অনিরাপদ

গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনের প্রক্রিয়া নয়; এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, জবাবদিহি ও আইনের শাসনের সমন্বিত রূপ...

রমজান হোক আত্মশুদ্ধি ও সুশাসনের মাস
২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

রমজান হোক আত্মশুদ্ধি ও সুশাসনের মাস

বাংলাদেশের আকাশে ১৪৪৭ হিজরির পবিত্র রমজানের চাঁদ দেখা যাওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে রহমত, মাগফেরাত ও ন...

অর্জন নাকি অর্ধসমাপ্ত রূপান্তর?
১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

অর্জন নাকি অর্ধসমাপ্ত রূপান্তর?

বিদায়ী ভাষণে সাফল্যের দাবি

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

বাজারে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী গ্যাস সংকটের সুযোগে অতিরিক্ত দাম নিচ্ছে, এর মধ্যেই সরকার গ্যাস সিলিন্ডারের দাম বাড়িয়েছে। এটা কতটা যুক্তিসঙ্গত মনে করেন?

মোট ভোট: ৩ | শেষ আপডেট: 3 সপ্তাহ আগে