গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

মেনু

উৎসবের আবরণে অন্তর্গত শূন্যতা, বৈশাখে সংস্কৃতির আত্মসমালোচনা

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ০৯:৪১ পিএম, ১৫ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ১৮:৩৬ এএম ২০২৬
উৎসবের আবরণে অন্তর্গত শূন্যতা, বৈশাখে সংস্কৃতির আত্মসমালোচনা
ছবি

এবার ঢাবির চারুকলা থেকে বের করা হয় বৈশাখী শুভযাত্রা- ফাইল ছবি

চৈত্রের অবসান আর বৈশাখের সূচনায় যে অনির্বাণ আলোর শিখা বাঙালির অন্তরে প্রজ্বলিত হওয়ার কথা, এ বছরের আয়োজন তার পূর্ণ দীপ্তি ধারণে কোথাও যেন ব্যর্থতার ছায়ায় আচ্ছন্ন। বাহ্যিক বর্ণচ্ছটায় রাঙানো উৎসবের অন্তরালে উঁকি দিয়েছে এক ধরনের নীরব শূন্যতা—যা কেবল আয়োজনগত ঘাটতির নয়, বরং সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তি, নীতিগত স্বচ্ছতা এবং জাতীয় চেতনার ধারাবাহিকতার গভীর সংকেতবাহী।

ঢাকার চারুকলার শোভাযাত্রা, যা একসময় ছিল বহুত্বের মিলনমেলা, সেখানে এবার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের দৃশ্যমান সংকোচন নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি আমাদের সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন। সময়স্বল্পতা কিংবা প্রশাসনিক ব্যাখ্যা দিয়ে এই ঘাটতি আড়াল করা গেলেও বাস্তবতা হলো—যে উৎসবের প্রাণই বৈচিত্র্য, সেখানে বৈচিত্র্যের সংকোচন মানেই আত্মার ক্ষয়।

তবে এই সংকটের বিপরীতে আরেকটি সমান্তরাল বাস্তবতা আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে—সংস্কৃতির ক্ষেত্র ক্রমেই বহুমাত্রিক ও প্রতিযোগিতামূলক এক পরিসরে রূপ নিচ্ছে। জাতীয় প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে আয়োজিত ভিন্নধর্মী বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে একটি রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণ এবং তাদের পক্ষ থেকে বিশ্বাসের ভিন্নতায় সহনশীলতার উচ্চারণ একদিকে ইতিবাচক বার্তা বহন করে, অন্যদিকে সংস্কৃতিকে নিজস্ব আদর্শিক বলয়ে টেনে নেওয়ার সূক্ষ্ম প্রবণতার ইঙ্গিতও দেয়।

সংস্কৃতি কখনোই বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়; এটি জাতির সম্মিলিত চেতনার নদী। সেই নদীকে যদি বিভিন্ন মতাদর্শিক খাতে বিভক্ত করা হয়, তবে তার স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। বৈশাখের চেতনা যে অসাম্প্রদায়িক, সর্বজনীন ও মানবিক—তা কেবল উচ্চারণে নয়, বাস্তব অংশগ্রহণে প্রতিফলিত হওয়াই কাম্য। বিচ্ছিন্ন বা সমান্তরাল আয়োজন যদি মূলধারার সাংস্কৃতিক ঐক্যকে দুর্বল করে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক বিভাজনের বীজ বপন করতে পারে।

অন্যদিকে, প্ল্যাকার্ডে উচ্চারিত প্রতিবাদ, শিশু নির্যাতনবিরোধী আহ্বান, পরিবেশ রক্ষার দাবি—এসব আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সংস্কৃতির আসল শক্তি তার প্রতিবাদী কণ্ঠে। আবার রমনার বটমূলের সুর, পাহাড়ের বৈসাবি কিংবা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের উৎসব আমাদের দেখায়—বাংলার প্রাণশক্তি এখনও বহমান, এখনও বহুত্বে ঐক্য খুঁজে পেতে সক্ষম।

এই প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন এক গভীর আত্মসমালোচনা। সংস্কৃতি কি কেবল আনুষ্ঠানিকতা হয়ে যাচ্ছে? নাকি আমরা ধীরে ধীরে তার প্রাণশক্তিকে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও আদর্শিক সংকীর্ণতায় আবদ্ধ করছি? রাষ্ট্র, সমাজ ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের কাছে এ প্রশ্নের জবাব এখন সময়ের দাবি।

বৈশাখ আমাদের শিখিয়েছে—ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে পথচলার মন্ত্র। সেই মন্ত্র যদি বাস্তবে প্রতিফলিত না হয়, তবে উৎসব কেবল রঙিন আবরণে আবদ্ধ এক শূন্যতায় পরিণত হবে।

অতএব, আজকের অঙ্গীকার হোক—সংস্কৃতিকে বিভাজনের নয়, সংহতির শক্তিতে রূপান্তরিত করা; অংশগ্রহণকে প্রতীকি নয়, বাস্তব করা; এবং বৈশাখকে কেবল উৎসব নয়, জাতির আত্মিক পুনর্জাগরণের নির্ভেজাল প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।
সানা/আপ্র/১৫/৪/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

সমর্থনের নামে প্রাণহানি নয়, সৌহার্দ্যপূর্ণ ক্রীড়াসংস্কৃতির বিজয় হোক
১৭ জুলাই ২০২৬

সমর্থনের নামে প্রাণহানি নয়, সৌহার্দ্যপূর্ণ ক্রীড়াসংস্কৃতির বিজয় হোক

খেলা মানুষের জীবনে আনন্দের রং ছড়িয়ে দেয়। মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে, কিন্তু সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার অন...

দুর্যোগের দিনে পরীক্ষা নয়, আগে চাই নিরাপদ জীবন
১৫ জুলাই ২০২৬

দুর্যোগের দিনে পরীক্ষা নয়, আগে চাই নিরাপদ জীবন

প্রকৃতির রুদ্ররূপ যখন জনপদকে বিপর্যস্ত করে, মানুষের জীবন যখন নিরাপত্তাহীনতার চরম পরীক্ষার মুখোমুখি দ...

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার: রাষ্ট্রচিন্তার এক প্রজ্ঞাবান প্রহরীর বিদায়
১৪ জুলাই ২০২৬

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার: রাষ্ট্রচিন্তার এক প্রজ্ঞাবান প্রহরীর বিদায়

রাষ্ট্রের ইতিহাসে কিছু মানুষের প্রস্থান কেবল একটি জীবনের অবসান নয়; তা একটি মূল্যবোধ, একটি রাজনৈতিক স...

প্রকৃতির রুদ্ররোষে বিপন্ন জনপদ, দুর্যোগ মোকাবিলায় চাই নতুন দর্শন
১৩ জুলাই ২০২৬

প্রকৃতির রুদ্ররোষে বিপন্ন জনপদ, দুর্যোগ মোকাবিলায় চাই নতুন দর্শন

প্রকৃতি কখনো সতর্ক করে, কখনো কঠিন পরীক্ষায় ফেলে। সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধস দেশের দক্...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই