ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে ইসমাইল হোসেন নামের এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধারের ঘটনায় রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য, বাসে ভাড়া দেওয়ার সময় ইসমাইলের কাছে থাকা বিপুল পরিমাণ টাকা নজরে পড়ে বাসের সুপারভাইজারের। পরে চালক ও সহকারীর সঙ্গে মিলে তাঁকে টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন সুপারভাইজার। অন্য যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়ার পর ইসমাইলকে বাসে আটকে রেখে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে তাঁর লাশ ফেলে রাখা হয় এক্সপ্রেসওয়ের বনানী অংশে।
এ ঘটনায় বাসচালক সোহেল রানা, সুপারভাইজার সাজু লস্কর ওরফে লিমন এবং সহকারী মাহবুব আলম মনিরকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাঁদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দুটি গামছা, রক্তমাখা দুটি আসনের কভার ও একটি মুঠোফোন জব্দ করা হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে ‘রাজ ক্লাসিক’ নামের বাসটিও।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ কেন্দ্রে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মো. ফারুক হোসেন। তিনি বলেন, বনানী থানা-পুলিশ তদন্ত করে এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে।
পুলিশ জানায়, গত ৪ সেপ্টেম্বর সকাল পৌনে নয়টার দিকে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী অংশে একটি লাশ পড়ে থাকার খবর পায় তারা। ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশটি উদ্ধার করে বনানী থানা-পুলিশ। নিহত ব্যক্তির মুখ ও দুই হাতে স্কচটেপ প্যাঁচানো ছিল। গলায় কালো দাগও দেখা যায়। সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়।
পরে তথ্যপ্রযুক্তি ও আঙুলের ছাপের মাধ্যমে নিহতের পরিচয় শনাক্ত করে পুলিশ। তাঁর পরিবারের সদস্যরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে মরদেহের ছবি দেখে তাঁকে শনাক্ত করেন। নিহত ব্যক্তি জামালপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন। তাঁর বয়স ৪৯ বছর বলে বনানী থানা-পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য, ইসমাইল জামালপুর থেকে বাসে করে গাজীপুরে যাচ্ছিলেন। জমি বিক্রির প্রায় পাঁচ লাখ টাকা তাঁর সঙ্গে ছিল। তাঁর ছেলে হাসান বাবার আসার অপেক্ষায় গাজীপুরের জিরানী বাসস্ট্যান্ডে ছিলেন। কিন্তু ইসমাইলের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়ায় তিনি পরে বাসায় ফিরে যান।
তদন্তে পুলিশ ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে। ফুটেজ বিশ্লেষণে একটি যাত্রীবাহী বাসের গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হয়। পরে বাসটির অবস্থান শনাক্ত করে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়। শনিবার রাতে মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে ‘রাজ ক্লাসিক’ বাসটি জব্দ করা হয়। সেখান থেকে সুপারভাইজার সাজু ও সহকারী মনিরকে গ্রেফতার করা হয়। পরে পৃথক অভিযানে বাসচালক সোহেল রানাকে গ্রেফতার করা হয়।
পুলিশ জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনজনই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁদের দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, গত ৪ সেপ্টেম্বর ভোর সাড়ে চারটার দিকে জামালপুর থেকে বাসে ওঠেন ইসমাইল। পথে একপর্যায়ে সুপারভাইজার সাজু তাঁর কাছে ভাড়া চান। ইসমাইল লুঙ্গির কোচর থেকে টাকা বের করে ভাড়া দেন। তখন তাঁর কাছে আরো টাকা থাকার বিষয়টি নজরে পড়ে সাজুর।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সাজু বিষয়টি বাসচালক সোহেলকে জানান। তাঁদের ধারণা হয়, ইসমাইলের কাছে আরো বিপুল পরিমাণ টাকা রয়েছে। এরপর তাঁরা তাঁর কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাসটি চন্দ্রা বাসস্ট্যান্ডে গেলেও ইসমাইলকে সেখানে নামানো হয়নি। অন্য যাত্রীদের গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে নামিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ইসমাইলকে নিয়ে বাসটি ঢাকার দিকে আসতে থাকে।
পুলিশের দাবি, একপর্যায়ে সুপারভাইজার সাজু ও সহকারী মনির ইসমাইলের দুই হাত স্কচটেপ দিয়ে বেঁধে ফেলেন। তাঁর নাক-মুখও টেপ দিয়ে আটকে দেওয়া হয়। পরে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। এরপর তাঁর লাশ ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী অংশে ফেলে রেখে বাস নিয়ে মহাখালী বাস টার্মিনালে চলে যান তাঁরা।
এ ঘটনায় ইসমাইলের ছেলে হাসান বাদী হয়ে ৪ সেপ্টেম্বর বনানী থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গ্রামের বাড়ির জমি বিক্রি করে পাওয়া নগদ পাঁচ লাখ টাকা এবং বিভিন্ন ধরনের খাদ্যদ্রব্য নিয়ে ইসমাইল গাজীপুরে যাচ্ছিলেন। তাঁর সঙ্গে থাকা ওই টাকা ও মালামাল পরে পাওয়া যায়নি।
এজাহারে আরো বলা হয়েছে, ইসমাইলের আসার খবরে তাঁর ছেলে হাসান গাজীপুরের জিরানী বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছিলেন। বাবার মুঠোফোনে কল করেও সেটি বন্ধ পান। সকাল ১০টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে তিনি বাসায় ফিরে যান। পরে দুপুর ১২টার দিকে বনানী থানা থেকে তাঁর প্রতিবেশীকে ফোন করে লাশ উদ্ধারের বিষয়টি জানানো হয়। মরদেহের ছবি দেখে হাসান তাঁর বাবাকে শনাক্ত করেন।
পুলিশের দেওয়া তথ্যে আরো জানা যায়, সাজু লস্করের বিরুদ্ধে দুটি ডাকাতির মামলা রয়েছে। বাসচালক সোহেল রানার বিরুদ্ধে দুটি ডাকাতি ও দুটি মাদক মামলা রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে দুটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও রয়েছে।
এদিকে, এ মামলায় গ্রেফতার তিন আসামিকে রোববার আদালতে হাজির করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বনানী থানার উপপরিদর্শক নজরুল ইসলাম তালুকদার সাজু ও মনিরের স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডের আবেদন করেন। একই সঙ্গে বাসচালক সোহেল রানাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়।
ঢাকার পৃথক দুই মহানগর হাকিমের আদালত সাজু ও মনিরের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করেন। পরে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়। অন্যদিকে, শুনানি শেষে ঢাকার মহানগর হাকিম আরিফুল ইসলামের আদালত সোহেল রানার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
পুলিশের পক্ষ থেকে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অন্য কোনো ব্যক্তি বা ঘটনায় লুট হওয়া টাকা ও মালামালের বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
সানা/আপ্র/৬/৯/২০২৬