পৃথিবীর সব মহাদেশ একদিন আবার পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি বিশাল অতি-মহাদেশ গঠন করবে—বিজ্ঞানীরা কয়েক দশক ধরেই এমন সম্ভাবনার কথা বলে আসছেন। প্রায় ২০ কোটি বছর আগে অতি-মহাদেশ প্যানজিয়া ভেঙে গিয়ে ধীরে ধীরে পৃথিবীর বর্তমান মহাদেশগুলোর সৃষ্টি হয়েছিল। বিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রায় ২০ কোটি বছর পর ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় পৃথিবী আবারো একটি অতি-মহাদেশের রূপ নিতে পারে।
তবে ভবিষ্যতের এই ভৌগোলিক পরিবর্তনের সম্ভাব্য বিভিন্ন বিন্যাসের মধ্যে একটি পরিস্থিতি পৃথিবীর মানুষসহ সব স্তন্যপায়ী প্রাণীর জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
২০১৮ সালে জিওলজিক্যাল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি গবেষণা নিবন্ধে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে অতি-মহাদেশ গঠনের চারটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা তুলে ধরা হয়েছে।
নভোপ্যানজিয়া: এই পরিস্থিতিতে প্রশান্ত মহাসাগর ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে বন্ধ হয়ে যাবে এবং একই সময়ে আটলান্টিক মহাসাগর আরো বিস্তৃত হবে। আমেরিকা মহাদেশ পূর্ব এশিয়া ও অ্যান্টার্কটিকার সঙ্গে সংঘর্ষের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে একটি বিশাল ভূখণ্ড তৈরি করবে। এর কেন্দ্র মূলত উত্তর গোলার্ধে অবস্থান করবে।
বিষুবরেখার কাছাকাছি অঞ্চলগুলো উষ্ণ ও শুষ্ক হয়ে উঠলেও উপকূলীয় এলাকাগুলোতে প্রচুর বৃষ্টিপাত হতে পারে। তবে নতুন ভূখণ্ড শীতল অক্ষাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত থাকায় সমুদ্রের প্রবাহ ও মেরু অঞ্চলের বরফের গতিপ্রকৃতি অনেকটাই স্বাভাবিক থাকতে পারে।
অরিকা: পর্তুগালের লিসবন বিশ্ববিদ্যালয়ের টেকটোনিকসের সহকারী অধ্যাপক জোয়াও সি. দুয়ার্তের তৈরি এই অনুমান অনুযায়ী, প্রশান্ত ও আটলান্টিক—দুই মহাসাগরই একসময় বন্ধ হয়ে যাবে। একই সঙ্গে মহাদেশগুলোর অভ্যন্তরীণ অংশ ভেঙে গিয়ে বিষুবরেখাকে ঘিরে একটি বলয় তৈরি হতে পারে।
দুয়ার্তের মতে, এই অতি-মহাদেশের বড় অংশ বিষুবরেখার কাছাকাছি থাকায় পৃথিবীর বর্তমান অবস্থার তুলনায় পরিবেশ কিছুটা বেশি উষ্ণ ও শুষ্ক হতে পারে।
আমাসিয়া: এই পরিস্থিতিতে আর্কটিক বা উত্তর মহাসাগর বন্ধ হয়ে যাবে। অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া প্রায় সব মহাদেশ উত্তর মেরুর দিকে সরে গিয়ে সেখানে একত্রিত হবে। এর ফলে দক্ষিণ গোলার্ধ একটি বিশাল মহাসাগরে পরিণত হতে পারে।
মাঝখানে বড় কোনো ভূখণ্ড না থাকায় বিষুবরেখা থেকে মেরু অঞ্চলে তাপ বহনকারী সামুদ্রিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে। এতে মেরু অঞ্চল সারা বছর বরফে ঢাকা এবং অত্যন্ত শীতল হয়ে উঠতে পারে।
প্যানজিয়া আলটিমা বা প্রক্সিমা: এই পরিস্থিতিতে আটলান্টিক মহাসাগর পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। একই সঙ্গে ভারত মহাসাগরও সংকুচিত হয়ে একটি অভ্যন্তরীণ সাগরে পরিণত হতে পারে। আমেরিকা ও এশিয়া মহাদেশের সংঘর্ষের ফলে পৃথিবীর সব মহাদেশ বিষুবরেখার চারপাশে একত্রিত হয়ে একটি বিশাল বলয়াকৃতির ভূখণ্ড গঠন করতে পারে।
মানুষের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ কোনটি: বিজ্ঞানীদের মতে, অরিকা বা আমাসিয়ার কারণে নির্দিষ্ট কিছু স্থল ও সামুদ্রিক প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটতে পারে। তবে প্যানজিয়া আলটিমা পরিস্থিতি পৃথিবীর সমগ্র মানবজাতির জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
এই অতি-মহাদেশের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলগুলো মহাসাগরের আর্দ্র বাতাস থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থান করবে। ফলে মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৯০ শতাংশই উত্তপ্ত ও শুষ্ক মরুভূমিতে পরিণত হতে পারে। এর সঙ্গে সূর্যের উজ্জ্বলতা ও উত্তাপও বাড়বে।
এর ওপর টেকটোনিক প্লেটের ব্যাপক স্থানান্তরের কারণে ধারাবাহিক আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটতে পারে। এতে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সে সময় পৃথিবীর তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে। পুরো পৃথিবীর মাত্র ৮ থেকে ১৬ শতাংশ এলাকা স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বসবাসের উপযোগী থাকতে পারে বলে গবেষণায় আশঙ্কা করা হয়েছে।
প্রচণ্ড তাপ ও বাতাসহীন পরিবেশে মানবদেহ অতিরিক্ত তাপ বাইরে বের করে দিতে ব্যর্থ হতে পারে। ফলে তাপমাত্রা স্তন্যপায়ী প্রাণীদের সহনশীলতার সীমা ছাড়িয়ে গিয়ে এক মহাবিলুপ্তির পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
তবে আপাতত স্বস্তির বিষয়, এই সম্ভাব্য বিপর্যয় ঘটতে এখনও প্রায় ২০ কোটি বছর বাকি। ফলে বর্তমান মানবজাতির কেউই এর মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আর তত দিনে নতুন ও বৈরী পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম কোনো নতুন প্রজাতির আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে জীবনের নতুন অধ্যায়ও শুরু হতে পারে। সূত্র: উইয়ন নিউজ
সানা/ডিসি/আপ্র/৬/৯/২০২৬