একেএম ফজলুল হক: পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে ব্যাহত হচ্ছে ট্রেন পরিচালনা ও যাত্রীসেবা। গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় পূর্বাঞ্চলের ৫৩টি রেলস্টেশন বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে ৫১টি সম্পূর্ণ এবং দুটি আংশিক বন্ধ। দীর্ঘদিন স্টেশনগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকায় একদিকে যাত্রীসেবা ও রেলওয়ের রাজস্ব আয় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে মূল্যবান সরঞ্জাম ও সম্পদ চুরি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্টেশন মাস্টার, গেটকিপার, পয়েন্টসম্যান ও লোকোমাস্টারসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রয়োজনীয়সংখ্যক জনবল না থাকায় কর্মরতদের ওপর বাড়তি দায়িত্ব পড়ছে। কোথাও কোথাও প্রয়োজনীয় কর্মী না থাকায় স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে গেটকিপার ও পয়েন্টসম্যান সংকটে রেলক্রসিং এবং স্টেশন পরিচালনায় ঝুঁকি বাড়ছে।
পূর্বাঞ্চল চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্টের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পূর্বাঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে অনুমোদিত জনবলের প্রায় অর্ধেকই নেই। স্টেশন মাস্টার গ্রেড-১ পদে ২৭টি অনুমোদিত পদের একটিতেও কর্মকর্তা কর্মরত নেই। গ্রেড-২-এর ৬৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র একজন; শূন্য রয়েছে ৬৩টি পদ।
স্টেশন মাস্টার গ্রেড-৩-এর ১৫৬টি পদের মধ্যে কর্মরত ১৩৪ জন, শূন্য ২২টি। গ্রেড-৪-এর ২৪৫টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৬৬ জন, শূন্য রয়েছে ১৭৯টি। সহকারী স্টেশন মাস্টারের ৩৬৬টি অনুমোদিত পদের মধ্যে কর্মরত ১৪৭ জন, শূন্য ২১৯টি। কেবিন মাস্টারের ৪০টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৭ জন, শূন্য ২৩টি।
সবচেয়ে বেশি সংকট গেটকিপার ও পয়েন্টসম্যান পদে। ৪৫০টি অনুমোদিত গেটকিপার পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৯৪ জন; শূন্য রয়েছে ২৬৫টি। আর ৯৮৫টি পয়েন্টসম্যান পদের মধ্যে কর্মরত ৫৫৮ জন, শূন্য রয়েছে ৪২৭টি।
জনবল সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্টেশন পরিচালনায়। স্টেশন মাস্টার ও পয়েন্টসম্যান না থাকায় অনেক স্টেশনের সিগন্যাল রুম ও টিকিট কাউন্টারে তালা ঝুলছে। ফলে ওইসব স্টেশন দিয়ে যাত্রীসেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রেলওয়ের রাজস্ব আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় স্টেশনগুলোর মূল্যবান সরঞ্জাম ও অন্যান্য সম্পদও নিরাপত্তাঝুঁকিতে রয়েছে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, পূর্বাঞ্চলের ঢাকা বিভাগের ৩২টি স্টেশন সম্পূর্ণ এবং দুটি আংশিক বন্ধ রয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগের ১৯টি স্টেশনই সম্পূর্ণ বন্ধ। চট্টগ্রাম বিভাগের বন্ধ স্টেশনগুলোর মধ্যে রয়েছে বাড়বকুন্ড, বারৈয়াঢালা, মিরসরাই, মস্তাননগর, মুহুরীগঞ্জ, কালিদহ, শশদী, নাওটি, আলীশহর, ময়নামতি, ঝাউতলা, সরকারহাট, কাঞ্চননগর, ধলঘাট, দৌলতগঞ্জ, খিলা, বজরা, শাহাতলী ও চিতোষী রোড।
বিভাগীয় পরিবহন বিভাগ বলছে, প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় এসব স্টেশন চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় জনবল চেয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। জনবল নিয়োগ হলে পর্যায়ক্রমে বন্ধ স্টেশনগুলো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জনবল সংকটের বড় প্রভাব পড়েছে ট্রেন পরিচালনাতেও। পূর্বাঞ্চলে ১২০ জন লোকোমাস্টারের প্রয়োজন হলেও কর্মরত আছেন মাত্র ৬৫ জন। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক লোকবল দিয়েই ট্রেন পরিচালনা করতে হচ্ছে। এতে কর্মরত লোকোমাস্টারদের ওপর বাড়তি দায়িত্ব পড়ছে এবং ট্রেনের সময়সূচি ঠিক রাখাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য লোকোমাস্টারদের আগে মাইলেজসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হতো। এসব সুবিধা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনে অনীহা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবও পড়ছে ট্রেনের সময়সূচিতে।
লোকোমাস্টার মো. ওমর ফারুক বলেন, মাইলেজসহ বেশ কিছু সুবিধা বাতিল হওয়ায় লোকোমাস্টাররা অতিরিক্ত ডিউটি করতেও অনীহা প্রকাশ করছেন। আগে জনবল সংকট থাকায় নিয়মিত ডিউটির পরও তাঁরা অতিরিক্ত কাজ করতেন। এর জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হতো। এখন সেগুলোও নেই।
তিনি বলেন, রেলওয়ের নিয়ম অনুযায়ী ১০০ মাইল বা আট ঘণ্টা ট্রেন পরিচালনার জন্য রানিং স্টাফরা এক দিনের মূল বেতনের সমপরিমাণ রানিং ভাতা বা মাইলেজ পেতেন। বর্তমানে সেই সুবিধা নেই।
ফলে একদিকে প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে একের পর এক স্টেশন বন্ধ থাকছে, অন্যদিকে সীমিত জনবল দিয়ে ট্রেন পরিচালনা করতে গিয়ে বাড়ছে কর্মরতদের ওপর চাপ। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা স্টেশনগুলোর সম্পদ ও নিরাপত্তা রক্ষার বিষয়টিও এখন রেলওয়ের জন্য নতুন উদ্বেগ হয়ে উঠেছে।
সানা/আপ্র/৬/৯/২০২৬