‘আপনারা কি কেউ দেখেছেন আমার মেয়েকে? এক বছর ধরে আমার মেয়ে নিখোঁজ। খুঁজে পাচ্ছি না। আপনারা আমার সন্তানকে খুঁজে দিন। গ্রামে আমার একটা ভিটেবাড়ি আছে। কেউ আমার মেয়েকে এনে দিতে পারলে পুরস্কার হিসেবে ওই ভিটেবাড়ি দিয়ে দেব।’
ডায়াসে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন নিখোঁজ শিশু রূপা আক্তারের মা স্বপ্না আক্তার। নিখোঁজ শিশুদের পরিবারের উদ্যোগে এবং জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় আয়োজিত ‘আমার সন্তান কোথায়?’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বপ্না আক্তারের মতো আরো ৪০টি পরিবারের মা-বাবা অনুষ্ঠানে এসেছিলেন তাঁদের হারিয়ে যাওয়া সন্তানের কথা বলতে। একজনের বেদনা ছুঁয়ে যাচ্ছিল অন্যজনকে। কেউ ডুকরে কাঁদছিলেন, কেউ নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলছিলেন। প্রত্যেকের হাতে ছিল হারিয়ে যাওয়া সন্তানের ছবিসহ প্ল্যাকার্ড। কারও প্ল্যাকার্ডে লেখা—৩৭০ দিন ধরে নিখোঁজ, কারও—৮ দিন। আবার কারও প্ল্যাকার্ডে লেখা—৬ হাজার ৫৫৩ দিন ধরে নিখোঁজ।
হারিয়ে যাওয়া সন্তানদের খুঁজে দিতে তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ১৫ হাজার ৭১৭টি শিশু নিখোঁজের অভিযোগে সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৩৮ শিশু এখনো নিখোঁজ। অন্যদের উদ্ধার করা হয়েছে।
স্বপ্না আক্তারের সঙ্গে অনুষ্ঠানে এসেছিল তাঁর বড় সন্তান মো. সিয়াম (১০)। তার হাতে ছিল বোনের ছবি। স্বপ্না জানান, তিনি স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে রাজধানীর পল্লবীতে থাকেন। তাঁর স্বামী মো. রাজন ভ্যানে করে শিশুদের খেলনা বিক্রি করেন। গত বছরের ২৯ আগস্ট বাসার কাছে একটি দোকানের সামনে থেকে তিন বছর বয়সী রূপা নিখোঁজ হয়। সিসিটিভি ফুটেজে এক তরুণকে রূপাকে নিয়ে হেঁটে যেতে দেখা যায়।
পল্লবী থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন স্বপ্না। কিন্তু এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও মেয়ের সন্ধান পাননি। তিনি বলেন, ‘মেয়ে বেঁচে আছে, নাকি মরে গেছে সেটাও জানি না। কিন্তু মেয়েকে পাওয়ার আশা একমুহূর্ত ছাড়তে পারি না। আপনারা আমাদের ভিডিওগুলো শেয়ার করুন, আমাদের সন্তানদের খুঁজে দিন। মৃত্যুর আগে একবার হলেও সন্তানকে দেখে যেতে চাই।’
রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার সরিষা প্রেমটিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র মো. তামিম ওরফে আবদুল্লাহ (১৫)। গত বছরের ২০ মে স্কুলে যাওয়ার উদ্দেশে বাসা থেকে বের হয়ে আর ফেরেনি সে। তামিমের বাবা মো. নজরুল ইসলাম অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কনস্টেবল। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, দুই ছেলেমেয়ের মধ্যে তামিম ছোট। বাংলাদেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত খুঁজেও ছেলের সন্ধান পাননি তিনি। সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আশায় কবিরাজ থেকে শুরু করে ‘জিন নামায়’ এমন ব্যক্তির কাছেও গেছেন। যে যা করতে বলেছেন, করেছেন।
নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সবার কাছে অনুরোধ, আমার যা কিছু আছে সব দিয়ে দেব। আমি রাস্তায় নেমে যাব। আমি আমার সন্তানকে চাই।’
তহুরা ইসলাম (২২) জানান, তাঁর ছেলে নিখোঁজ হওয়ার এক মাস ২০ দিন পেরিয়ে গেছে। এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন তিনি। নবাবগঞ্জের দোহায় শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে বাসার একটি কক্ষে দুই বছরের সন্তান মো. তোহা আদনানকে মুঠোফোন দিয়ে বসিয়ে পাশের কক্ষে যান তহুরা। পাঁচ মিনিট পর ফিরে এসে দেখেন ছেলে নেই। বিছানায় পড়ে ছিল মুঠোফোনটি।
লামিয়া নামের এক শিশুকে কোলে নিয়ে অনুষ্ঠানে এসেছিলেন মো. সবুজ মিয়া ও চম্পা বেগম (২৫)। চম্পা জানান, তাঁদের যমজ সন্তান সামিয়া ও লামিয়া। আড়াই বছর আগে বাড়ির সামনে খেলতে থাকা অবস্থায় সামিয়া নিখোঁজ হয়। প্রতিবেশী এক ব্যক্তিকে আসামি করে অপহরণের অভিযোগে মামলা করেন তিনি। তবে মাত্র তিন মাস পর ওই ব্যক্তি কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে আসেন। এখনো মেয়ের সন্ধান পাননি চম্পা।
ছয় মাস আগে টিকটকে একটি শিশুকে নিয়ে তৈরি করা ভিডিও দেখে সেটিকে তাঁর হারিয়ে যাওয়া সামিয়া বলে দাবি করেন চম্পা। শিশুটি যশোরের একটি পরিবারের কাছে আছে জানতে পেরে সেখানে গেলেও পুলিশের সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ তাঁর। চম্পার ভাষ্য, পুলিশ বলেছে, ‘এই মেয়েটি তাঁর নয়।’
চাঁদপুরের শিশু খাদিজা (৬) ও ধামরাইয়ের শিশু গনেশ (৫) পাশের বাড়িতে খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হয়। খাদিজা ১ হাজার ৯৭৪ দিন এবং গনেশ ৩৩৩ দিন ধরে নিখোঁজ।
মুক্তিপণের টাকা দিয়েও মেয়ে মানতাশাকে (৮) উদ্ধার করতে পারেননি দিনাজপুরের মনিরুজ্জামান মনি। গত বছরের মে মাসে বাসার সামনে থেকে তাঁর সন্তান নিখোঁজ হয়। মেয়ের স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে অনুষ্ঠানে আকুল হয়ে কাঁদছিলেন তিনি।
তবে এক বছর পর হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে ফিরে পাওয়ার গল্পও ছিল অনুষ্ঠানে। আজাদ রহমান জানান, কর্মস্থলে পূর্বশত্রুতার জেরে গত বছরের জুলাই মাসে তাঁর সাত বছর বয়সী মেয়ে আশফিয়াকে টঙ্গীতে বাড়ির সামনে থেকে অপহরণ করা হয়। মেয়ের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, তাকে পপকর্ন খাইয়ে ট্রেনে তুলে দেওয়া হয়েছিল। ফলে সে বাড়ির কথা কিছুই মনে করতে পারেনি।
সন্তানের শোকে পাঁচ মাস পর মারা যান আজাদের স্ত্রী শামসুন্নাহার। পরে পুলিশের মাধ্যমে গত মাসে পুবাইলে সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে মেয়েকে খুঁজে পান আজাদ।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, শিশু নিখোঁজ-সংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরির সংখ্যা ২০২৩ সালে ছিল ১৭ হাজার ৮০৮টি। ২০২৪ সালে তা কমে ১৬ হাজার ৪১৪টি হলেও ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২২ হাজার ৫৫০টিতে। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই হয়েছে ১৫ হাজার ৭১৭টি সাধারণ ডায়েরি।
অনুষ্ঠানে জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের সভাপতি মো. সাদাত রহমান বলেন, ২০২৪ সালে সিলেটে শিশু মুনতাহা নিখোঁজ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর এক লাখ মানুষের পিটিশন স্বাক্ষরের মাধ্যমে বাংলাদেশে নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধারে অ্যাম্বার অ্যালার্ট ব্যবস্থা চালুর দাবি জানানো হয়।
এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের সহযোগিতায় এবং জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের পরিচালনায় মিসিং আর্জেন্ট নোটিফিকেশন বা মুন অ্যালার্ট এবং টোল হেল্পলাইন ১৩২১৯-এর পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালু করা হয়। বর্তমানে এটি দেশব্যাপী শিশু নিখোঁজ প্রতিরোধ ও উদ্ধারে সহায়ক একটি উদ্যোগ হিসেবে কাজ করছে।
অনুষ্ঠানে নিখোঁজ শিশুদের সন্ধান ও নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা, দীর্ঘদিন অমীমাংসিত থাকা ঘটনাগুলোর পুনঃতদন্ত ও অগ্রগতি পর্যালোচনা, শিশু নিখোঁজ ও পাচার প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
সানা/আপ্র/৬/৯/২০২৬