রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর প্রথমবারের মতো নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে সফরে গিয়ে সংঘাত ও হানাহানির রাজনীতি পরিহার করে সমঝোতা ও সহিষ্ণুতার ভিত্তিতে রাজনীতি করার আহ্বান জানিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, অনেক ত্যাগ ও রক্তপাতের বিনিময়ে অর্জিত গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করে দেশে সমঝোতার রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত গুণীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন রাষ্ট্রপতি। এ সময় তিনি ঠাকুরগাঁওয়ে কোনো ধরনের সংঘাত বা সংঘর্ষ না করার জন্য সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ শান্তিপ্রিয় ও নির্ঝঞ্ঝাট। তাঁরা ঝামেলা পছন্দ করেন না। এ কারণে জেলায় মামলা-মোকদ্দমার সংখ্যাও তুলনামূলক কম। এই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ধরে রাখতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের রাজনীতি করবে, মতবাদ প্রচার করবে; কিন্তু কোনোভাবেই সংঘাতে জড়ানো যাবে না।
মির্জা ফখরুল বলেন, অতীতে গণতন্ত্রকামী মানুষের ওপর অকথ্য নির্যাতন হয়েছে। তাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছে, হাজার হাজার মিথ্যা মামলা দিয়ে শ্রমিক ও কৃষকদের হয়রানি ও নির্যাতন করা হয়েছে। আল্লাহর অশেষ রহমতে সেই সময় পেরিয়ে এসেছেন তাঁরা। এখন আর সেই রক্তপাত দেখতে চান না।
তিনি বলেন, ‘অনেক ত্যাগের বিনিময়ে, অনেক রক্তপাতের মধ্য দিয়ে আমরা আজ এখানে এসেছি। এই রক্তপাত আর দেখতে চাই না। যে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছি, লড়াই করেছি, সেই গণতন্ত্রকে আমরা রক্ষা করতে চাই। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা তৈরি করতে চাই। বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থেই একটি সমঝোতার রাজনীতি দেখতে চাই।’
রাষ্ট্রপতি বলেন, রাজনীতির পাশাপাশি মানুষের অভাব কীভাবে দূর করা যায়, শিক্ষার উন্নয়ন কীভাবে করা যায় এবং তরুণদের কর্মসংস্থান কীভাবে নিশ্চিত করা যায়—সেদিকেও নজর দিতে হবে। ঠাকুরগাঁওয়ের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শেষ করে যেন চাকরি, ব্যবসা কিংবা অন্য কোনো কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
তিনি বলেন, হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান—কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা যাবে না। সবাই যেন একসঙ্গে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারে, সেটিই প্রত্যাশা। এ ক্ষেত্রে ঠাকুরগাঁওবাসী অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘কোনো হানাহানি নয়, কোনো সংঘর্ষ নয়। আলোচনার মধ্য দিয়ে আমরা রাজনীতি করব। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে সহিষ্ণুতা। সেই সহিষ্ণুতা নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করতে পারলেই গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হবে।
তরুণদের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি বলেন, শুধু চাকরি ও ঠিকাদারির পেছনে না ছুটে নিজেদের দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। নিজেদের কর্মসংস্থান নিজেরাই সৃষ্টি করার উদ্যোগ নিতে হবে। ঠাকুরগাঁওয়ের অনেক নারী ইতিমধ্যে নিজেদের কাজ শুরু করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, আরো বেশি মানুষ উদ্যোক্তা হলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
তরুণ ও যুবসমাজকে মাদকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, মাদক বর্জন করতে হবে এবং নিজেদের এলাকাকে মাদকমুক্ত হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
রাষ্ট্রপতি জানান, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। ঠাকুরগাঁওয়ে কলকারখানা স্থাপনের চেষ্টা চলছে। শিগগিরই কৃষি খাতে বিনিয়োগকারী আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি ঠাকুরগাঁওয়ে একটি ক্রীড়া গ্রাম তৈরি করা হবে বলেও জানান তিনি।
এর আগে রোববার দুপুর সোয়া একটার দিকে সার্কিট হাউজে পৌঁছালে জেলা পুলিশের একটি সুসজ্জিত দল রাষ্ট্রপতিকে গার্ড অব অনার দেয়। পরে তিনি পারিবারিক কবরস্থানে গিয়ে বাবা-মায়ের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানান ও দোয়া করেন।
এর আগে দুপুর ১টার দিকে হেলিকপ্টারযোগে ঠাকুরগাঁওয়ে পৌঁছান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর এটিই তাঁর নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে প্রথম সফর। দুই দিনের সফর শেষে সোমবার তাঁর ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে।
সানা/আপ্র/৬/৯/২০২৬