জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত প্রস্তাবিত আইনে ‘দ্বৈত প্রয়োগের’ সুযোগ রাখা হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, দুর্বল আইন পাসের অংশীদার হতে চান না তাঁরা। এ কারণে বিলটির আলোচনায় অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) রাত ৮টা ১০ মিনিটের দিকে সংসদ থেকে বেরিয়ে যান বিরোধী দলের সদস্যরা।
এ সময় অধিবেশন পরিচালনা করছিলেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল উত্থাপনের আহ্বান জানান তিনি।
বিলের বিরোধিতা করে বক্তব্যে শফিকুর রহমান বলেন, প্রস্তাবিত আইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কমিশনের ক্ষমতার ক্ষেত্রে স্পষ্ট দ্বৈত প্রয়োগ রাখা হয়েছে। সাধারণ কোনো নাগরিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করলে কমিশন সরাসরি তদন্ত করতে পারবে। কিন্তু কোনো শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে আগে সংশ্লিষ্ট বাহিনী বা সংস্থার কাছে প্রতিবেদন চাওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রথম নোটিশের জবাব না দিলে কী হবে, সে বিষয়ে আইনে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। আবার প্রথম জবাব সন্তোষজনক না হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে সুপারিশ করার পর পরবর্তী পর্যায়ে তদন্তের সুযোগ রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সদস্যরাও দেশের নাগরিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, একই অপরাধের ক্ষেত্রে একজনের বিরুদ্ধে সরাসরি তদন্ত করা যাবে, আর অন্যজনের ক্ষেত্রে তা আটকে যাবে—এটা হতে পারে না।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘দুর্বল আইনের পাসের অংশীদার হবো না। আমরা এ আইনের আলোচনায় অংশগ্রহণ করছি না এবং আমরা এখন ওয়াকআউট করছি।’ এর জবাবে স্পিকার বলেন, ‘ওয়াকআউট করার জন্য আপনাদেরও ধন্যবাদ।’
২৭ আগস্ট সংসদে বিল উত্থাপন: এর আগে গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান। বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। কমিটিকে দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল।
এরপর ৩০ আগস্ট স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিলটি পর্যালোচনার জন্য উপস্থাপন করা হলে জামায়াতের দুই সদস্য ডা. মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান ও অ্যাডভোকেট আল ফারুক আবদুল লতিফ বৈঠক বর্জন করেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, বিলটি আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এত অল্প সময়ে অংশীজন ও মানবাধিকারকর্মীদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় মতবিনিময়ের সুযোগ রাখা হয়নি।
জামায়াতের সংসদীয় দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান আরো অভিযোগ করেন, ২০২৫ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের তুলনায় নতুন বিলটি শক্তিশালী না হয়ে বরং দুর্বল করা হয়েছে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা সীমিত করার কারণে কমিশন কার্যকরভাবে কাজ করতে পারবে না বলে দাবি করেন তিনি।
শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষেত্রে বিশেষ বিধান: প্রস্তাবিত আইনে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী, পুলিশ, আনসার, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, সরকারি গোয়েন্দা ও তদন্তকারী সংস্থা, র্যাবসহ বিভিন্ন বিশেষ ও যৌথ বাহিনীকে শৃঙ্খলা বাহিনীর আওতায় রাখা হয়েছে।
এসব বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতিবেদন চাওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। সেই প্রতিবেদন পেয়ে কমিশন সন্তুষ্ট হলে আর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে না। সন্তুষ্ট না হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করতে পারবে কমিশন।
সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে সুপারিশ পাওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা কমিশনকে জানাতে হবে। নির্ধারিত সময়ে জানানো না হলে অথবা নেওয়া ব্যবস্থা সন্তোষজনক না হলে কমিশন স্বপ্রণোদিত হয়ে সাধারণ অভিযোগ নিষ্পত্তির বিধান অনুযায়ী কার্যক্রম নিতে পারবে।
এই বিধানকে মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন তদন্ত ক্ষমতা সংকুচিত করার পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। সংস্থাটির মতে, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে থাকা স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা বাদ দিয়ে নতুন খসড়ায় অনেকটা ২০০৯ সালের আইনের কাঠামো ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
কমিশনের ক্ষমতায় থাকছে কিছু নতুন বিধান: প্রস্তাবিত নতুন আইনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাখার কথা বলা হয়েছে। একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনার নিয়ে কমিশন গঠনের বিধান রয়েছে। তাঁদের মধ্যে অন্তত একজন নারী থাকবেন। রাষ্ট্রপতি চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ করবেন। বাছাই কমিটি গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আবেদন বা মনোনয়ন আহ্বান করে প্রতিটি পদের বিপরীতে দুজন করে প্রার্থীর নাম সুপারিশ করবে।
আইন, বিচার, প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমাজসেবা, নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী অধিকার ও পরিবেশসহ মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অন্তত ১৫ বছরের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে। চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের মেয়াদ সর্বোচ্চ পাঁচ বছর এবং একই ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। তাঁদের অপসারণের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকের মতো পদ্ধতি অনুসরণের বিধান রয়েছে।
অভিযোগ লিখিত, মৌখিক বা নির্ধারিত অন্য মাধ্যমে বিনা ফিতে করার সুযোগ থাকবে। গণমাধ্যমসহ অন্য কোনো মাধ্যমে তথ্য পাওয়ার পর কমিশন স্বপ্রণোদিত হয়েও ব্যবস্থা নিতে পারবে। সাধারণভাবে ঘটনার ছয় মাসের মধ্যে অভিযোগ করতে হবে। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে কমিশন বিলম্বের বিষয়টি বিবেচনা করে অভিযোগ গ্রহণ করতে পারবে।
অভিযোগ পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা যাবে। তদন্ত শেষ করতে হবে তিন মাসের মধ্যে; প্রয়োজনে আরো ৩০ দিন সময় বাড়ানো যাবে। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিভাগীয়, শৃঙ্খলামূলক বা প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করতে পারবে কমিশন।
এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তাঁর আইনগত প্রতিনিধিকে প্রকৃত ক্ষতির দ্বিগুণ বা তার বেশি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতাও কমিশনকে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। কমিশনের আদেশ অমান্য করলে তা অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করার বিধান রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও জবাবদিহির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সরকার বলছে, বিল আগের চেয়ে কঠোর: জামায়াতের অভিযোগের বিপরীতে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের তুলনায় নতুন খসড়ায় বিভিন্ন শাস্তির বিধান আরো কঠোর করা হয়েছে। প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, অধ্যাদেশে কোনো অপরাধের জন্য ছয় মাসের কারাদণ্ডের বিধান থাকলেও নতুন বিলে তা বাড়িয়ে ১০ বছর করা হয়েছে। তাই বিলটি দুর্বল করা হয়েছে—এমন দাবি সঠিক নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বিরোধী দলের সদস্যদের সংসদে থেকেই বিলের দুর্বলতা বা প্রয়োজনীয় সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, সংসদে দায়িত্বশীলভাবে আলোচনা করেই প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
অন্যদিকে, সংসদীয় কমিটির সুপারিশের পর বিলটি নিয়ে বিরোধ আরো স্পষ্ট হয়েছে। জামায়াত শুরু থেকেই জানিয়ে আসছে, বিলটির পাস প্রক্রিয়ার কোনো পর্যায়েই তারা অংশ নেবে না। সেই অবস্থান থেকেই রোববার রাতে সংসদে বিলটির আলোচনার সময় ওয়াকআউট করল দলটি।
মানবাধিকার কমিশন বিলের পাশাপাশি একই সময়ে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল নিয়েও সংসদে আলোচনা চলছে। এ দুটি আইনকে ঘিরে সরকার ও বিরোধী দলের মতপার্থক্য এখন সংসদীয় বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
সানা/আপ্র/৬/৯/২০২৬