বেঁচে থাকার আনন্দটুকু যখন ফিকে হয়ে আসে, তখন অস্তিত্বের ভার বহন করা বড় অসহ্য ঠেকে। মানুষ তখন আত্মহত্যার মতো এক অন্ধকার সিদ্ধান্ত নেয়। বর্তমান পৃথিবীতে এটি আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এক ভয়াবহ মহামারী। এক সময় ভাবা হতো কেবল অভাব বা শারীরিক যন্ত্রণায় মানুষ প্রাণ দেয়। কিন্তু এখনকার আসল সংকট মনের গহিন শূন্যতা। আমাদের জীবনযাত্রার দ্রুত পরিবর্তনের নেতিবাচক ছায়াই হলো এই ক্রমবর্ধমান আত্মহনন। এর পেছনে কোনো নির্দিষ্ট একটি কারণ নেই; বরং ব্যক্তিগত বিষাদ, সামাজিক দূরত্ব আর অর্থনৈতিক যন্ত্রণার এক জটিল সংমিশ্রণ কাজ করে। এ বিষয় নিয়েই এবারের নারী ও শিশু পাতার প্রধান ফিচার
আমাদের এই যান্ত্রিক শহর আর রাতারাতি সফল হওয়ার নেশা আমাদের ধৈর্যটুকু কেড়ে নিয়েছে। সামান্য হোঁচট খেলেই আমরা খেই হারিয়ে ফেলি, হারিয়ে ফেলি মনের জোর। শরীরের সমস্যা নিয়ে আমরা হুলস্থূল করি ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতর যে দীর্ঘশ্বাস জমে থাকে, তাকে ‘পাগলামি’ বলে উড়িয়ে দিই। ফলে অসুস্থ মানুষটি হাজারো মানুষের ভিড়েও একা হয়ে পড়ে। আমাদের পাড়া-প্রতিবেশীর সেই সময়টুকু এখন নেই, পাশের ফ্ল্যাটে কারা আছে সেটুকু দেখার মতো ফুরসত আজ কারোর নেই। ‘ডিজিটাল একাকিত্ব’ আর সোশ্যাল মিডিয়ার ওই বাহারি মিথ্যাগুলো মানুষকে ক্রমাগত হীনম্মন্যতায় ডোবাচ্ছে। এমনকি সাইবার বুলিংয়ের মতো আধুনিক হেনস্তার শিকার হয়েও অনেক সংবেদনশীল প্রাণ ঝরে যাচ্ছে অকালে।
আমরা এক অদ্ভুত সময়ে বাস করছি, যেখানে সবকিছুই আমাদের ‘তৎক্ষণাৎ’ চাই। দ্রুত টাকা, দ্রুত যশ আর দ্রুত স্বীকৃতির নেশা আমাদের অস্থির করে তুলেছে। যখনই এই আকাশছোঁয়া প্রত্যাশায় সামান্য ঘাটতি দেখা দেয়, তখনই জীবনের হিসাব মেলাতে না পেরে মানুষ মৃত্যুকে এক সহজ মুক্তি বলে ভুল করে। আধুনিকতা আমাদের অঢেল স্বাচ্ছন্দ্য দিলেও অলক্ষ্যে আমাদের মানসিক দৃঢ়তাটুকু কেড়ে নিয়েছে। ভেতরটা যখন কষ্টে নীল হয়ে যায়, তখনই মানুষ অন্ধকারের দিকে পা বাড়ায়। মনের ভেতরের সেই ঝড়ো হাওয়া দেখার মতো চোখ আমাদের খুব কম মানুষেরই আছে। এক বিচিত্র ইঁদুর-দৌড়ে আমরা আমাদের সন্তানদের ঠেলে দিচ্ছি। ছোটবেলা থেকেই শিখিয়ে দিচ্ছি জিপিএ-৫ আর নামি বিশ্ববিদ্যালয়ের জয়গান। তাদের জেতাতে শেখাচ্ছি ঠিকই কিন্তু হার মেনে নিয়ে আবার ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়ানোর শিক্ষাটা দিতে আমরা সম্পূর্ণ ভুলে গেছি। ফলে কৈশোরে পা দিতেই প্রেমে ব্যর্থতা কিংবা ক্যারিয়ারের সামান্য ধাক্কা তারা সামলাতে পারছে না। পরিবারের পাহাড়প্রমাণ প্রত্যাশার চাপ সইতে না পেরে কত তরুণ প্রাণ অকালে ঝরে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বেকারত্বের গ্লানি আর মাদকের মরণকামড়। নেশার ঘোরে মানুষ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে; যা শেষ পর্যন্ত তাকে গভীর বিষণ্নতার দিকে ঠেলে দেয়। কাজ হারিয়ে বা ব্যবসায় লোকসান খেয়ে সমাজে মুখ দেখানোর ভয়েও অনেকে এই পথ ধরেন।
আজকাল সম্পর্কগুলো বড় কাচের মতো ভঙ্গুর হয়ে গেছে- সামান্য অভিমানেই ভেঙে যায়। একসময় পরিবারের স্নেহ ছিল আশ্রয়, এখন যান্ত্রিক একাকিত্বে সবাই ডুবে নিজের দুনিয়ায়। সামান্য বিশ্বাসঘাতকতা কিংবা তির্যক কথাতেই মন দমে যায়। ধর্ম, নীতি, অর্থ- সবকিছুর প্রতিযোগিতায় হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের ভেতরের আলো। তবু পরিবর্তন সম্ভব- যদি আমরা কান পাতি একে অপরের কথায়, বিচার না করে পাশে দাঁড়াই। ঘরে তৈরি হয় এমন জায়গা, যেখানে ভরসায় বলা যায় ‘আমার কষ্ট হচ্ছে।’ ভালোবাসার শক্তি শাসনের থেকেও গভীর। মানসিক যত্নও শারীরিক চিকিৎসার মতো জরুরি- স্কুলে, অফিসে, মনে, সর্বত্র। পরিবারের ভেতরে খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে- যেখানে সন্তান তার ভুলের কথা বা কষ্টের কথা অকপটে বলতে পারে। শাসন আর চাপের চেয়ে ভালোবাসার শক্তি অনেক বেশি কার্যকর। মানসিক স্বাস্থ্যকে আর অবহেলা করা চলবে না। শরীরের চেকআপের মতো মনের যত্ন নেওয়াটাও এখন সময়ের দাবি। স্কুল থেকে অফিস- সর্বত্র এক সহমর্মিতার পরিবেশ চাই। রাষ্ট্রকেও কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষার দিকে নজর দিতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ার সেই মরীচিকা ছেড়ে আমাদের আবার রক্ত-মাংসের মানুষের কাছাকাছি ফিরতে হবে।
আসলে আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়, বরং এ এক চূড়ান্ত অভিমান- যা নিজের জীবনের গল্পটাকে মাঝপথে থামিয়ে দেয়। অথচ ওই না বলা কথাগুলোর দায় আর সারাজীবনের কান্না বয়ে বেড়াতে হয় কাছের মানুষগুলোকে। প্রতিটি জীবনই অমূল্য। একটু ভালোবাসা আর সঠিক সময়ে পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিতে পারলে হয়তো অনেক প্রাণ বেঁচে যাবে।
আপ্র/ কেএমএএ/০৬.০৫.২০২৬