শিশুর বয়স মাত্র ১১ বছর। সে পড়ে নেত্রকোনার মদন উপজেলার একটি কওমি মাদ্রাসায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে। গত ২৩ এপ্রিল তার পরিবার মদন উপজেলায় একটি মামলা করেন। ওই মামলায় অভিযোগ করা হয় গত বছরের নভেম্বরে তার মাদ্রাসাটির শিক্ষক তাকে ধর্ষণের পর বিষয়টি জানাজানি না করতে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। পরে শিশুর পরিবার বিষয়টি জানতে পারে গত এপ্রিলে। অভিযুক্ত শিক্ষক ও তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
শিশুটির পরিবারের সদস্যরা জানান, গত কয়েকদিন ধরে ওই শিশুর শারীরিক আকৃতিতে পরিবর্তন আসার পর তার পরিবার বিষয়টি নিয়ে জানতে চান। এক পর্যায়ে সে ঘটনাটি জানানোর পর তারা থানায় মামলা দায়ের করে। তার পেটে অস্বাভাবিক কিছু দেখতে পেয়ে মদন উপজেলার একটি হাসপাতালে নিয়ে যান পরিবারের সদস্যরা। আলাট্রাসনোগ্রাম করার পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘটনাটির পরিস্থিতি তুলে ধরে ছোট একটি ভিডিও আপলোড করেন গাইনি চিকিৎসক সায়েমা আক্তার। তিনি বলেছেন, ওই ভিডিওতে ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরার পরই বিভিন্ন জায়গা থেকে নানা ধরনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। মামলার ১৪ দিন পর অভিযুক্ত ওই মাদ্রাসা শিক্ষককে পুলিশ আটক করলেও তিনি ভিডিও বার্তায় বিভ্রান্তি ছড়িয়েছের বলে অভিযোগ করেছে ওই শিশুটির পরিবার। ধর্ষণের এই ঘটনাটিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা সমালোচনা তৈরির পর মঙ্গলবার দুপুরে ওই শিশুটির বাড়িতে গিয়ে কিছু ফল ও শুকনো খাবার দিয়ে এসেছে উপজেলা প্রশাসন।
মামলার এজাহারে বলা হয়, গত বছরের দোসরা নভেম্বর বিকেলে মাদ্রাসা ছুটির পর অভিযুক্ত শিক্ষক মেয়েটিকে ডেকে মাদ্রাসা সংলগ্ন মসজিদ ঝাড়ু দিতে বলেন। ওইদিন বিকেলে মাদ্রাসার অন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বাড়ি চলে যান। ঝাড়ু শেষে একটি কক্ষে মেয়েটিকে ডেকে নিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে ধর্ষণ করেন। এ ঘটনা কাউকে জানালে ওই শিশুকে এবং তাঁর মা ও ছোট ভাইদের মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। এর চার-পাঁচ দিন পর আবারো শিশুটিকে ধর্ষণ করেন ওই মাদ্রাসা শিক্ষক। সম্প্রতি ওই শিশু অসুস্থ বোধ করছিল এবং তার মধ্যে শারীরিক পরিবর্তন দেখা যায়। পরে তার মা সিলেট থেকে এসে মেয়েকে জিজ্ঞাসাবাদ করে বিষয়টি জানতে পারেন। পরে গত ১৮ এপ্রিল শিশুকে মদন উপজেলা শহরে একটি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসক জানান, শিশুটি অন্তঃসত্ত্বা। পরে এ ঘটনায় ওই ছাত্রীর মা বৃহস্পতিবার বাদী হয়ে থানায় মামলা করেন’।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, মেয়ের কাছ থেকে এই ঘটনাটি জানতে পেরে ওই শিক্ষকের ভাইয়ের কাছে বিষয়টি নিয়ে নালিশ দেন ভুক্তভোগীর পরিবার। কিন্তু বিষয়টি কাউকে না জানাতে হুমকি প্রদান করা হয় বলেও জানানো হয় অভিযোগে।
মদন থানার ওসি মো. তরিকুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, ডাক্তারের রিপোর্ট অনুসারে ঘটনাটি ঘটেছে। আমরা মেয়েটির পরিবারের সাথেও কথা বলেছি। তারা মামলা করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় পুলিশ মামলা নিয়েছে।
মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, নেত্রকোনার মদন উপজেলার পাঁচহার গ্রামে ২০২২ সালে ‘হযরত ফাতেমাতুযযাহরা কওমি মহিলা মাদরাসা’ নামের এই মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠা হয়। অভিযুক্ত ওই শিক্ষক নিজেই প্রতিষ্ঠা করেন মহিলা মাদ্রাসাটি এবং নিজেই যার পরিচালক এবং তারই স্ত্রী মাদ্রাসাটির প্রধান শিক্ষক। ওই মাদ্রাসার শিক্ষক মাহবুবুর রহমান জানান, চার বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এই মাদ্রাসায় প্রায় একশোরও বেশি ছাত্র-ছাত্রী পড়াশোনা করতো। মাদ্রাসার পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলার পর থেকে বতর্মানে মাদ্রাসাটি বন্ধ আছে।
নেত্রকোনার মদন উপজেলা সদর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দুরে অবস্থিত এই মাদ্রাসাটি।
গত সোমবার অজ্ঞাত স্থান থেকে ওই শিক্ষকের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে- যাতে অভিযুক্ত ওই শিক্ষককে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বক্তব্য দিতে দেখা যায়।
মিজ আক্তার বলেন, ‘বাচ্চাটা আমার পরিচিতও না। তার কোন আত্নীয়ও আমার পরিচিত না। অন্য আট দশটা রোগীর মতোই সে রোগী হিসেবে আমার কাছে এসেছে। আমি বিস্তারিত শোনার পরই এটা নিয়ে কথা বলেছি। তিনি অভিযোগ করেন, ওই ঘটনার পরই দেশ ও দেশের বাইরে থেকে বিভিন্ন মানুষ তাকে নানা ধরনের হুমকি ও সাইবার বুলিং করছে। তাকে নানা ধরনের হুমকিও দিচ্ছে। ওরা বলতেছে আমি নাকি টাকা খাইছি, আমি নাকি ভুয়া, আমার সার্টিফিকেট ভুয়া, আমার নামে সব ধরনের মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে। এখন এমন একটা অবস্থা হইছে আমি আমার বাচ্চাকে স্কুলেও পাঠাতে পারবো না।’
ওই শিশুরি এখন কী হবে: মামলার এজাহারে শিশুটির পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে গত বছরের নভেম্বরে শিশুটিকে ধর্ষণের পর তাকে ঘটনাটি কাউকে না জানাতে হুমকি দিয়েছিল অভিযুক্ত শিক্ষক।
শিশুর মামা জানান, গত মাসখানেক আগে শিশুটির শরীরে তারা পরিবর্তন দেখতে পান। ওই শিশুটির পিতা তার মাকে ডিভোর্স দিয়ে চলে গেছেন। শিশুটির মা সিলেটে গৃহকর্মীর কাজ করেন। যে কারণে শিশুটি মদন উপজেলায় তার নানার বাড়িতে থাকেন। ওই ঘটনার পর মাদ্রাসার ওই শিক্ষক তাকে হুমকি দেওয়ার কারণে তাদের ভাগ্নি ঘটনাটি কাউকে বলেনি। পরিবারের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার পর শিশুর মা আসেন সিলেট থেকে। পরে গত মাসে মামলা দায়ের করা হয়।
মদন থানার ওসি মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের ধারণা ওই শিক্ষক এই ঘটনায় হয়তো জড়িত। যদি জড়িত না থাকতো তাহলে তো সে পালাতো না।
চিকিৎসক সায়েমা আক্তার জানান, অন্তঃসত্ত্বা হওয়া শিশুটির বর্তমান বয়স ১১ বছর কিংবা তার চেয়ে একটু বেশি। শিশুটির ওজন মাত্র ৩০ কেজি। তিনি বলেন, মাত্র ৩০ কেজি ওজনের ১১ বছরের একটা শিশুর পেটে যে বাচ্চা সেটির ওজন ৯০০ গ্রামের বেশি। এই অবস্থায় ও কী করবে আমরা কল্পনা করতে পারছি না। এই বয়সের মেয়েটাকে যদি ডেলিভারি করানো হয় সে কী বাঁচবে? সিজার করলে বাঁচানো যাবে? আমরা জানি না। আমরা আসলে জানি না তার ভবিষ্যতটা আসলে কী?
ভুক্তভোগী শিশুটির মা ক বলেন, ‘আমরা জানি এখন কি করবো। আমরা এই ঘটনার বিচার চাই।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বেদবতী মিস্ত্রী বলেন, মেয়েটির শারীরিক অবস্থা এখন খুব খারাপ। সে রক্তশূন্যতায় ভুগছে। হিমোগ্লোবিনের অভাব আছে। আমরা তার চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করবো। আমরা পরিবারটিকে বলে এসেছি শিশুটির বাচ্চা প্রসব হওয়া পর্যন্ত তার চিকিৎসার দায়িত্ব সরকারের। আমাদের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা থাকবে।
আপ্র/কেএমএএ/০৬.০৫.২০২৬