যুক্তরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামোর বিরুদ্ধে গত এক বছরে দুই শতাধিক সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে দেশটির জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা। এসব হামলার বড় অংশের পেছনে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বা বিদেশি রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টারের প্রধান নির্বাহী রিচার্ড হর্ন বলেছেন, পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, হাসপাতাল, বিমানবন্দর এবং জরুরি পরিষেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো বর্তমানে ক্রমবর্ধমান সাইবার হুমকির মুখে রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের ফলে আগামী কয়েক বছরে এ ঝুঁকি আরো বাড়তে পারে।
ব্রিটিশ গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মে মাস পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো এবং এর সহায়ক ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে দুই শতাধিক সাইবার হামলার ঘটনা শনাক্ত করেছে এনসিএসসি। এর প্রায় ৭৫ শতাংশ হামলার পেছনে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বা বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষের সংযোগ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রিচার্ড হর্ন বলেন, রাশিয়া, চীন ও ইরানের মতো বৈরী রাষ্ট্রগুলো ধারাবাহিকভাবে যুক্তরাজ্যের জরুরি পরিষেবাগুলোর পেছনে থাকা কম্পিউটার ব্যবস্থা ও নেটওয়ার্ককে লক্ষ্যবস্তু করছে। তার ভাষায়, আন্তর্জাতিক প্রতিপক্ষদের সঙ্গে যুক্তরাজ্য বর্তমানে এক অব্যাহত প্রতিযোগিতার মধ্যে রয়েছে।
লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটে দেওয়া এক বক্তৃতায় তিনি বলেন, এ প্রতিযোগিতা কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্র বা সীমিত পরিসরে আবদ্ধ নয়। বরং এটি এমন এক বিস্তৃত ক্ষেত্র, যেখানে সামগ্রিক সক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এনসিএসসি সাইবার হামলাকে কম্পিউটার ব্যবস্থা, নেটওয়ার্ক বা ডিজিটাল যন্ত্রের ক্ষতি করা, কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটানো কিংবা অননুমোদিত প্রবেশ ও নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে।
সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী সতর্ক করে বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতি জাতীয় অবকাঠামোর বিদ্যমান দুর্বলতাগুলো আরো সহজে শনাক্ত ও কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করছে। বিশেষ করে ২০২৮ সালের মধ্যে এ ধরনের হুমকি আরো দৃশ্যমান ও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
তার মতে, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাইবার নিরাপত্তার মৌলিক বিষয়গুলো আরো শক্তিশালী করতে হবে। হামলার পর দ্রুত স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে আসার সক্ষমতা নিশ্চিত করাও এখন গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
সম্প্রতি উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির প্রসারের পর সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয় ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর সাইবার হামলার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অধিকাংশ সাইবার নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা এখনো পুরোনো ও পরিচিত দুর্বলতা থেকেই ঘটে। দুর্বল পাসওয়ার্ড, অপর্যাপ্ত পরিচয় যাচাই ব্যবস্থা এবং সফটওয়্যারের পরিচিত ত্রুটি সময়মতো সংশোধন না করাই অনেক হামলার প্রধান কারণ।
রিচার্ড হর্ন বলেন, বর্তমান সাইবার হুমকি শুধু প্রযুক্তি বিভাগের সমস্যা নয়। এটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ থেকে শুরু করে তথ্যপ্রযুক্তি সহায়তা বিভাগ, এমনকি সাধারণ মানুষের ঘরোয়া ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলছে।
এর আগে ২০২৪ সালে যুক্তরাজ্যের তৎকালীন ডাচি অব ল্যাঙ্কাস্টারের চ্যান্সেলর প্যাট ম্যাকফ্যাডেনও সতর্ক করে বলেছিলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বিরুদ্ধে হামলা চালানো হতে পারে। তিনি অভিযোগ করেন, রাশিয়া দেশটির গণমাধ্যম, টেলিযোগাযোগ, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। এমনকি বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাও হামলার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা এমআইসিক্সের প্রধান ব্লেইস মেট্রেভেলিও। তার মতে, রাশিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণে দেশটি বর্তমানে শান্তি ও সংঘাতের মধ্যবর্তী এক জটিল পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে।
এদিকে সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্যও নতুন পরামর্শ দিয়েছে এনসিএসসি। সংস্থাটি প্রচলিত পাসওয়ার্ডের পরিবর্তে ‘পাসকি’ ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, ব্যবহারকারীর ডিভাইসে সংরক্ষিত এই ডিজিটাল পরিচয়পত্র আধুনিক সাইবার হুমকির বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে বেশি নিরাপদ এবং ভবিষ্যতের ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, এনসিএসসি
সানা/ডিসি/আপ্র/২০/৬/২০২৬