বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় আজ ফুটবলপ্রেমীদের নজর থাকছে হিউস্টনের মাঠে—যেখানে মুখোমুখি হচ্ছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল এবং এশিয়ার ক্রমোন্নত শক্তি জাপান। বাংলাদেশ সময় আজ সোমবার (২৯ জুন) রাত ১১টায় শুরু হতে যাওয়া এই ম্যাচকে ঘিরে ফুটবলবিশ্বে তৈরি হয়েছে তীব্র উত্তেজনা, কারণ এটি কেবল একটি নকআউট ম্যাচ নয়; বরং অনেকের চোখে এটি ‘গুরু-শিষ্য’ সম্পর্কের এক ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
জাপানের ফুটবল উন্নয়নের ইতিহাসে ব্রাজিলের প্রভাব গভীর ও দীর্ঘদিনের। ১৯৯০-এর দশকে জে-লিগ চালুর পর থেকেই ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার ও কোচরা জাপানের ক্লাব ফুটবলে ব্যাপকভাবে যুক্ত হন। জিকো, দুঙ্গা, সাম্পাইয়োসহ বহু ব্রাজিলিয়ান তারকা জাপানের ফুটবলে পেশাদারিত্ব, কৌশল ও আক্রমণাত্মক ফুটবলের নতুন মানদণ্ড তৈরি করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপানের আধুনিক ফুটবল কাঠামোর ভিত্তি গড়ে উঠেছে সেই ব্রাজিলিয়ান প্রভাবেই।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জাপান সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের আলাদা পরিচয় গড়ে তুলেছে। ইউরোপিয়ান ফুটবলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তারা এখন শৃঙ্খলা, গতি ও কৌশলগত ভারসাম্যের জন্য বিশ্বমঞ্চে পরিচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জার্মানি, স্পেন ও ইংল্যান্ডের মতো পরাশক্তিকে হারিয়ে জাপান দেখিয়েছে, তারা আর শুধুই আন্ডারডগ নয়। গত অক্টোবরে প্রীতি ম্যাচে ব্রাজিলকে ৩–২ ব্যবধানে হারানোও তাদের আত্মবিশ্বাসকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
তবে বিশ্বকাপের ইতিহাসে দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়ের একমাত্র সাক্ষাৎ ২০০৬ সালে, যেখানে ৪–১ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল ব্রাজিল। এবার পরিস্থিতি ভিন্ন—দুই দলই শক্তিশালী এবং নকআউট পর্বে পৌঁছে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের মিশনে নেমেছে।
এই ম্যাচে জাপানের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে তারকা উইঙ্গার তাকেফুসা কুবোর অনুপস্থিতি। হাঁটুর চোটের কারণে ‘জাপানের মেসি’ হিসেবে পরিচিত এই খেলোয়াড়কে ছাড়াই মাঠে নামতে হচ্ছে দলকে। প্রথম ম্যাচে চোট পাওয়ার পর থেকে তিনি পুরোপুরি ফিট হতে পারেননি, যা জাপানের আক্রমণভাগে বড় শূন্যতা তৈরি করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ব্রাজিল শিবিরেও রয়েছে কৌশলগত অনিশ্চয়তা। কোচ কার্লো আনচেলত্তি জানিয়েছেন, তারকা ফরোয়ার্ড নেইমার এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ফিট হলেও পুরো ম্যাচ খেলানো হবে কিনা তা নির্ভর করবে ম্যাচের পরিস্থিতির ওপর। দীর্ঘদিন পর জাতীয় দলে ফেরা নেইমার ধাপে ধাপে ম্যাচ ফিটনেস ফিরে পাচ্ছেন এবং দলের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছেন।
ম্যাচের আগে উত্তাপ আরও বাড়িয়েছে জাপানের তরুণ স্ট্রাইকার কেনতো শিওগাইয়ের মন্তব্য। তিনি ব্রাজিলকে ‘পতিত পরাশক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করলে ফুটবল মহলে শুরু হয় তীব্র আলোচনা। তবে ব্রাজিল কোচ আনচেলত্তি এসব মন্তব্যকে গুরুত্ব না দিয়ে একে ‘মানসিক খেলা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এবং জানিয়েছেন, তাদের পূর্ণ মনোযোগ কেবল মাঠের পারফরম্যান্সেই।
ব্রাজিল অধিনায়ক মার্কিনিয়োস অবশ্য এই মন্তব্যকে প্রেরণা হিসেবে নিয়েছেন। তার মতে, এমন আলোচনা দলকে আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ করে এবং মাঠেই তার জবাব দেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে আজকের ম্যাচটি কেবল একটি নকআউট লড়াই নয়, বরং ফুটবল ইতিহাস, সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং আধুনিক শক্তির সংঘর্ষের প্রতিচ্ছবি। ব্রাজিল তাদের অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্য নিয়ে ফেভারিট হলেও, জাপানের শৃঙ্খলা, গতি এবং সাম্প্রতিক আত্মবিশ্বাস এই ম্যাচকে অনিশ্চয়তায় ভরা এক মহারণে পরিণত করেছে।
আজকের লড়াইয়ে তাই প্রশ্ন একটাই—গুরু কি শিষ্যের সামনে আবারও শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে পারবে, নাকি ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখবে জাপান?
সানা/আপ্র/২৯/৬/২০২৬