লর্ডস টেস্টে ১৯৪ রানের বড় ব্যবধানে জয় তুলে নিয়েছে ইংল্যান্ড। চার দিনেই দ্বিতীয় এই টেস্ট জিতে তিন ম্যাচের সিরিজে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেছে জো রুটের দল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের পর এই প্রথমবারের মতো একাধিক ম্যাচের কোনো টেস্ট সিরিজ জিতল ইংল্যান্ড।
পুরো সফরজুড়েই পাকিস্তানের ব্যাটিং ছিল বেশ শোচনীয়, এবারও তার উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি চোখে পড়েনি। ৩৮৯ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে সিরিজে টানা চতুর্থবারের মতো দুইশ রানের নিচেই আটকে যায় সফরকারীরা। আগের তিন ইনিংসে যথাক্রমে ১৭১, ১৩৫ ও ১১০ রান করা দলটি এবার থামে ১৯৪ রানে গিয়ে। প্রথম দিন ফিল্ডিংয়ের সময় চোটে পড়া ওপেনার ইমাম-উল-হাক দ্বিতীয় ইনিংসেও ব্যাটিংয়ে নামতে পারেননি।
সিরিজে আগের তিন ইনিংসে যথাক্রমে ৫, ১৪ ও ১৬ রান করা সাউদ শাকিল এবার দুর্দান্ত এক ইনিংস উপহার দেন, ১২২ বলে করেন ৯৭ রান। ১৩টি চার ও দুটি ছক্কার সাহায্যে সাজানো এই বাঁহাতি ব্যাটসম্যানের ইনিংসটি ছাপিয়ে গেছে ইতিহাসের পাতাও—ইংল্যান্ডের মাটিতে টেস্টের চতুর্থ ইনিংসে এটিই পাকিস্তানের কোনো ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ স্কোর। এর আগে ২০১০ সালে এই লর্ডসেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সালমান বাটের ৯২ রান ছিল আগের সর্বোচ্চ রেকর্ড।
বল হাতে আবারও আলো ছড়িয়েছেন অলি রবিনসন। প্রথম ইনিংসে ১১ রান খরচায় ৪ উইকেট নেওয়ার পর এই ইনিংসেও ২৪ রানে নেন আরও ৪টি উইকেট। টানা দ্বিতীয় টেস্টে ‘ম্যান অব দা ম্যাচ’ও নির্বাচিত হয়েছেন তিনিই।
এই সিরিজে দুই ম্যাচ খেলেই ৩২ বছর বয়সী এই পেসারের মোট উইকেটসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬টিতে। আগের দিনের ৭ উইকেটে ১৭৭ রান নিয়ে খেলতে নেমে রোববার আর মাত্র ৩১ রান যোগ করেই ২০৮ রানে গুটিয়ে যায় ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংস। প্রথম ইনিংসের ১৮০ রানের লিড মিলিয়ে পাকিস্তানের সামনে বড় লক্ষ্য দাঁড় করাতে সক্ষম হয় স্বাগতিকরা।
পরপর দুই ওভারে ড্যান লরেন্স (৫৪) ও রবিনসনকে ফিরিয়ে নিজের পাঁচ উইকেট পূর্ণ করেন মোহাম্মাদ আব্বাস। লর্ডসে নিজের আগের তিন ইনিংসে চারটি করে উইকেট নেওয়ার পর অবশেষে সম্মানজনক অনার্স বোর্ডে নাম লেখাতে সক্ষম হলেন ৩৬ বছর বয়সী এই পেসার।
উল্লেখযোগ্য বিষয়, ক্রিকেট তীর্থখ্যাত এই মাঠে এক ম্যাচে ৯ উইকেট নেওয়া পাকিস্তানের প্রথম পেসার হিসেবেও নাম লেখালেন তিনি। লর্ডসের ইতিহাসে এর আগে কোনো দলই ৩৪২ রানের বেশি লক্ষ্য তাড়া করে জিততে পারেনি।
ইংল্যান্ডের মাটিতে টেস্টের চতুর্থ ইনিংসে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ সংগ্রহ ছিল ২০১০ সালে এই মাঠেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে করা ২৮৯ রান। সেই রেকর্ড গড়ার চ্যালেঞ্জ নিয়ে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতেই বিপর্যয়ে পড়ে বাবর আজমের দল। মাত্র ১৪ রানের মধ্যেই হারিয়ে ফেলে ৩টি উইকেট। এদিনও উইকেটে ছিল যথেষ্ট মুভমেন্ট, আর সেটাই দারুণভাবে কাজে লাগান রবিনসন।
একই ওভারে আজান আওয়াইস ও আবদুল্লাহ শাফিককে ফিরিয়ে দেন তিনি—ভেতরে ঢোকা ডেলিভারিতে এলবিডব্লিউ হন আওয়াইস, আর অন্য এক চমৎকার ডেলিভারিতে বোল্ড হন শাফিক। এরপর জফ্রা আর্চার এক ভয়ঙ্কর বাউন্সারে বিদায় করে দেন বাবর আজমকে। হাতের চোটের কারণে প্রথম টেস্ট খেলতে না পারা পাকিস্তান অধিনায়ক দলে ফেরার এই ম্যাচে কোনো ইনিংসেই পৌঁছাতে পারলেন না দুই অঙ্কের ঘরে।
এরপরই পাঁচ নম্বরে ব্যাটিংয়ে নামেন শাকিল। ইংলিশ পেসারদের তীব্র আক্রমণ সামলে শান মাসুদকে নিয়ে একটি প্রতিরোধ গড়ে তোলেন তিনি, ফলে লাঞ্চ বিরতির আগে আর কোনো উইকেট হারায়নি পাকিস্তান। আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে মাত্র ৫৫ বলেই নিজের ফিফটি তুলে নেন শাকিল।
এর মাঝে বৃষ্টির কারণে কিছুক্ষণের জন্য খেলা বন্ধও হয়ে যায়। মাসুদকে এলবিডব্লিউ করে ৯৭ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি ভাঙেন রবিনসন। এর পরের ওভারেই বাজে শট খেলে নিজের উইকেট বিলিয়ে দেন মোহাম্মদ রিজওয়ান। এরপর টেল-এন্ডারদের নিয়েই সেঞ্চুরির লক্ষ্যে ছুটতে থাকেন শাকিল।
শর্ট বল বেশ দক্ষতার সঙ্গেই সামলাচ্ছিলেন তিনি—জশ টাংয়ের করা পাঁচ বলের মধ্যেই দুটি ছক্কা ও একটি চারের সাহায্যে পৌঁছে যান ৯৬ রানে। পরের ওভারে নেন আরও এক রান।
তবে টাংয়ের পরের ওভারেই আরেকটি শর্ট বলে সীমানায় ধরা পড়ে শেষ পর্যন্ত সেঞ্চুরি হাতছাড়া করেন তিনি। এরপর টাং নিজের পরবর্তী দুই ওভারে আরও দুটি উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচেরই ইতি টেনে দেন। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর এজবাস্টনে শুরু হবে সিরিজের তৃতীয় ও শেষ টেস্ট।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
ইংল্যান্ড ১ম ইনিংস: ২৯০
পাকিস্তান ১ম ইনিংস: ১১০
ইংল্যান্ড ২য় ইনিংস: ৫৪.২ ওভারে ২০৮ (আগের দিন ১৭৭/৭) (লরেন্স ৫৪, রবিনসন ৮, আর্চার ২*, টাং ১২; আব্বাস ২২-৩-৫৭-৫, শাহজাদ ১৪-৩-৫৬-২, আলি ১৬.২-১-৭০-২, উসমান ২-০-১৭-০)
পাকিস্তান ২য় ইনিংস: (লক্ষ্য ৩৮৯) ৫০.৫ ওভারে ১৯৪ (মাসুদ ২৬, আওয়াইস ৬, শাফিক ০, বাবর ৬, শাকিল ৯৭, রিজওয়ান ১, উসমান ১৬, শাহজাদ ৯, আব্বাস ১৩*, আলি ৮*; রবিনসন ১৪-৫-২৪-৪, আর্চার ১৫-১-৭৩-২, টাং ৮.৫-১-৪৬-৩, অ্যাটকিনসন ১১-২-৪১-০, লরেন্স ২-২-০-০)
ফল: ইংল্যান্ড ১৯৪ রানে জয়ী
সিরিজ: ৩ ম্যাচের সিরিজে ২-০তে এগিয়ে ইংল্যান্ড
ম্যান অব দা ম্যাচ: অলি রবিনসন
ডিসি/আপ্র/৩১/০৮/২০২৬