জীবনটা অন্যদের জন্য যেন একটু সহজ। বন্ধুর হাতে নতুন ফোন, নিজেরটা পুরোনো। অঙ্কটা কঠিন। অথচ পাশের জন দিব্যি বুঝে ফেলছে। পরীক্ষাটা খারাপ হয়েছে। খেলতে গিয়ে হেরে গেছে। বাইরে যাওয়ার সময় বৃষ্টি নেমেছে। ছোটদের জীবনে এমন অভিযোগের শেষ নেই। আর মা-বাবার কাছেও এসব বেশ চেনা দৃশ্য। তাই সন্তানের সমস্যাটিকে অস্বীকার না করে তা সমাধানে তর্ক করা যাবে না। কারণ সন্তানকে প্রতিটি সমস্যার সমাধান করে দেওয়া যেমন তাকে পরনির্ভরশীল করে তুলতে পারে, তেমনি তার অনুভূতিকে উপেক্ষা করাও ভালো ফল দেয় না।
সবার অভিযোগ ও সমস্যা এক নয়: সন্তান কোনো কষ্টের কথা বললেই সেটিকে ‘অভিযোগ’ বলে থামিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। প্রথম কাজ হলো সন্তানের কথা মন দিয়ে শোনা, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে তাকে সুরক্ষা ও সহায়তা দেওয়া। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, হতাশাজনক পরিস্থিতিতে মা-বাবার কাছ থেকে আবেগের স্বীকৃতি পাওয়া সন্তানদের কোনো কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়াতে পারে। অর্থাৎ ‘মন খারাপ করার কিছু নেই’ বলার চেয়ে ‘বুঝতে পারছি- এটা আসলেই কঠিন’ বলা অনেক বেশি সহায়ক হতে পারে। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত সন্তানের অভিযোগ বন্ধ করা নয়, অভিযোগের পরের চিন্তাটা বদলে দেওয়া।
কী করা যায়: ধরা যাক, সন্তান এসে বলল, ‘অঙ্কটা কিছুতেই বুঝতে পারছি না।’ ‘অঙ্ক এত কঠিন কিছু নয়, বুঝে করলেই পারবে’- এমন উত্তর না দিয়ে বলা যায়, ‘কোন জায়গাটা বুঝতে সমস্যা হচ্ছে? চলো তো দেখি সমস্যাটা ঠিক কোথায়।’ এভাবে ধীরে ধীরে সন্তান সমস্যাকে শুধু দুর্ভাগ্য হিসেবে না দেখে সেটির ভেতর নিজের করণীয় খুঁজতে শেখে।
সমাধান খুঁজতে শেখানোয় আসল: সন্তানকে সমস্যা সমাধান করতে শেখাতে গিয়ে কেউ কেউ বলতে পারেন, ‘তোমার সমস্যা, তুমিই সামলাও।’ এটি মোটেই বলা যাবে না। সন্তানের বয়স ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সাহায্য করতে হবে। কোনো কোনো সমস্যার সমাধান সে নিজেই করতে পারবে, কোনো ক্ষেত্রে মা-বাবার পরামর্শ লাগবে, আবার কোনো ক্ষেত্রে বড়দের সরাসরি হস্তক্ষেপ জরুরি।
সন্তানের হয়ে সব কাজ করে দেওয়া যাবে না: সন্তানের জুতার ফিতা বাঁধা থেকে শুরু করে স্কুলের প্রজেক্ট, বন্ধুর সঙ্গে ঝামেলা কিংবা পড়াশোনার ছোটখাটো সমস্যা- সবকিছুর সমাধান মা-বাবা নিজের হাতে নিয়ে নিলে সন্তান হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে স্বস্তি পায়। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের সমস্যা সমাধানের সুযোগও তার কমে যায়। তাই বয়স উপযোগী সমস্যায় একটু সময় দেওয়া যেতে পারে।
মা-বাবার আচরণও বড় শিক্ষা: ছোটরা শুধু আমাদের কথা শোনে না, আমাদের আচরণ দেখেও শেখে। রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি চলছে, গাড়িটা সামনে নেওয়ার উপায় নেই। তখন বাবা যদি সারাক্ষণ বলেন, ‘এই দেশের রাস্তাঘাট আর ঠিক হবে না’, সন্তানও হয়তো সমস্যাকে শুধু বিরক্তির কারণ হিসেবেই দেখতে শিখবে। অন্যদিকে বাবা যদি বলেন- ‘নাহ, এই রাস্তায় কাজ চলছে, অন্য রাস্তা দিয়ে ঘুরে যেতে হবে’; তাহলে একই পরিস্থিতিতে সন্তানের সামনে অন্য একটি মানসিক মডেল তৈরি হয়- সমস্যা এসেছে, এবার সমাধান খুঁজতে হবে।
একটি প্রশ্নই কি সব বদলে দিতে পারে: অবশ্যই এক প্রশ্নে কোনো সন্তানের মানসিকতা রাতারাতি বদলে যাবে না। আবার সব সমস্যার সমাধানও একটি প্রশ্নে পাওয়া সম্ভব নয়। তবে বারবার একই ধরনের প্রশ্ন করা সন্তানকে একটি নতুন অভ্যাস তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে।
‘কেন আমার সঙ্গেই এমন হয়’ প্রশ্নের জায়গায় ‘এখন আমি কী করতে পারি’- এ পরিবর্তনটিই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জীবনে সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। পরীক্ষার প্রশ্ন কঠিন হতে পারে, বৃষ্টি নামতে পারে, বন্ধু অন্য কারও সঙ্গে বেশি সময় কাটাতে পারে, কোনো পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে পারে- এসবের সবকিছু বদলে ফেলা সম্ভব নয়। কিন্তু পরিস্থিতির পর নিজের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সেটি অনেক ক্ষেত্রেই ভাবা সম্ভব। সন্তানকে সফল করার কোনো জাদুর ফরমুলা নেই। তবে তাকে এমনভাবে বড় করা যায়- যাতে ব্যর্থতা তাকে থামিয়ে না দেয়। সূত্র: মিডিয়াম।
কেএমএএ/আপ্র/৩১.০৮.২০২৬