গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬

মেনু

ইউরোপের রক্তাক্ত অতীত নাৎসি আমলের যুদ্ধজাহাজ

লাইফস্টাইল ডেস্ক

লাইফস্টাইল ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:৪৪ পিএম, ৩১ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ২০:৩২ এএম ২০২৬
ইউরোপের রক্তাক্ত অতীত নাৎসি আমলের যুদ্ধজাহাজ
ছবি

ছবি সংগৃহীত

নদীর পানি কমছে। একই সঙ্গে দানিউবের বুক থেকে একে একে জেগে উঠছে ইউরোপের রক্তাক্ত অতীত। মরিচা ধরা জাহাজের কাঠামো, ভাঙা মাস্তুল আর পানির ওপর উঁকি দেওয়া যুদ্ধজাহাজের ধ্বংসাবশেষ যেন আট দশক আগের এক ভয়াবহ সময়কে আবারও চোখের সামনে ফিরিয়ে আনছে।

তীব্র দাবদাহ ও খরায় দানিউব নদীর পানির স্তর রেকর্ড পরিমাণ নিচে নেমে যাওয়ায় পূর্ব সার্বিয়ার প্রাহোভোর কাছে অন্তত ২০টি জার্মান যুদ্ধজাহাজের ধ্বংসাবশেষ দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। এগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে ইচ্ছাকৃতভাবে ডুবিয়ে দেওয়া নাৎসি জার্মানির কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহরের জাহাজ। এর আগেও খরার সময় এসব ধ্বংসাবশেষ পানির নিচ থেকে ভেসে উঠেছিল। তবে এবারের তীব্র দাবদাহ ও দীর্ঘস্থায়ী খরায় কয়েক ডজন জাহাজ নতুন করে দৃশ্যমান হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, কিছু জাহাজের ভেতরে এখনও অস্ত্র ও অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ রয়েছে। তাই এই গ্রীষ্মে দানিউব ধরে ভ্রমণকারী পর্যটকদের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে এমন এক ভূদৃশ্য ও ইতিহাস- যা সাধারণত নদীর গভীর পানির নিচেই লুকিয়ে থাকে।

দানিউবের তলায় আট দশকের ইতিহাস: কীভাবে এসব যুদ্ধজাহাজ দানিউবের তলায় গিয়ে ঠাঁই পেলো, ওই গল্পের শুরু আট দশকেরও বেশি আগে। ১৯৪৪ সালে পূর্ব রণাঙ্গনে জার্মান বাহিনী পিছু হটতে শুরু করে। অন্যদিকে সোভিয়েত বাহিনী দ্রুত ওই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিতে এগিয়ে আসছিল। সেই সময় প্রায় ২০০টি নাৎসি জার্মানির কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহরের জাহাজ এমন এক এলাকায় আটকা পড়ে যায়, যা দ্রুত সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছিল। দানিউব তখন তাদের পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য পথ। কিন্তু নদীর সরু ও ঐতিহাসিকভাবে বিপজ্জনক অংশ ‘আয়রন গেটস’ হয়ে ওঠে বড় বাধা। রেড আর্মি এগিয়ে আসার মুখে ১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বরে জার্মান রিয়ার অ্যাডমিরাল পল-ভিলি জিব ২০০টিরও বেশি জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট, জাহাজগুলো যেন শত্রুর হাতে না পড়ে এবং একই সঙ্গে সোভিয়েত বাহিনীর অগ্রযাত্রায় বাধা সৃষ্টি হয়।

ভ্রমণ পরিকল্পনাকারী কেনেথ রিস- যিনি সম্প্রতি দানিউবের নিম্ন অববাহিকায় নদীভ্রমণ করেছেন। তিনি বলেন, আজ আপনি একটি নদীভ্রমণ জাহাজের ডেকে বসে হাতে এক গ্লাস ওয়াইন নিয়ে চারপাশের সুন্দর দেশগুলোর দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন। কিন্তু এই একই ভূদৃশ্য একসময় যুদ্ধ, ফ্যাসিবাদ, নিপীড়ন ও মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগের সাক্ষী ছিল।

নদীর তলায় লুকিয়ে থাকা বিপদ: সেই সময়ের পর থেকে বেশিরভাগ জাহাজই ডানিউবের পানির নিচে পড়ে আছে। অনেক জাহাজের ভেতরে এখনও অস্ত্র ও অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ থাকার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে এগুলো শুধু ইতিহাসের নিদর্শন নয়, নৌযান চলাচলের জন্যও সম্ভাব্য বিপদ। ধ্বংসাবশেষগুলো সরাতে সার্বিয়া আনুমানিক ৩ কোটি ইউরোর একটি কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তবে নদীর তলদেশ থেকে এসব জাহাজ নিরাপদে সরিয়ে ফেলা অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। এ কারণেই প্রকল্পটির অগ্রগতিও ধীর।

যুদ্ধজাহাজসহ জেগে উঠছে আরও ইতিহাস: দানিউবের পানি কমে যাওয়ায় শুধু নাৎসি আমলের যুদ্ধজাহাজই নয়; আরও নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন ও ধ্বংসাবশেষ নদীর বুক থেকে জেগে উঠছে। চলতি আগস্টে নদীর পানি নেমে যাওয়ায় বুদাপেস্টে জার্মান সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত একটি সামরিক মোটরসাইকেলও দৃশ্যমান হয়েছে। স্লোভাকিয়ার ভির্টের কাছে পাওয়া গেছে ১ হাজার ৫৪৩ পাউন্ড ওজনের একটি ব্রিটিশ বোমা, যা পরে নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করা হয়।

বুলগেরিয়ার গিগেন এলাকায় পানি কমে যাওয়ায় প্রাচীন কনস্টান্টাইন সেতুর ধ্বংসাবশেষও দৃশ্যমান হয়েছে। আর রিয়াহোভোর কাছে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা উদ্ধার করেছেন হাজার হাজার বছর আগের পশমি ম্যামথের দাঁত ও হাড়। বুলগেরিয়ার প্লেভেন আঞ্চলিক ইতিহাস জাদুঘরের প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ইতিহাস গবেষক পাভেল পোপভ বলেন, প্রত্নতাত্ত্বিকদের জন্য এ ধরনের মুহূর্ত অত্যন্ত মূল্যবান। এটি নিদর্শনগুলোকে তাদের প্রকৃত পরিবেশে পর্যবেক্ষণ, নথিভুক্ত ও গবেষণা করার জন্য আমাদের বিরল একটি সুযোগ করে দেয়।

অতীতের পাশাপাশি ভবিষ্যতেরও সতর্কবার্তা: দানিউব নদীতে খরা ও পানির স্তরের ওঠানামা নতুন কোনও ঘটনা নয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস জলবায়ু পরিবর্তন পরিষেবার তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপ বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশ। সেখানে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা তীব্র দাবদাহ বাড়াচ্ছে এবং বদলে দিচ্ছে বৃষ্টিপাতের ধরন। এর ফলে দানিউব নদীতে বারবার অস্বাভাবিকভাবে পানির স্তর কমে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে- যা নদীপথে নৌযান চলাচলেও ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে।

পর্যটকদের ভ্রমণেও পড়ছে প্রভাব: পানির স্তর কমে যাওয়ার প্রভাব ইতোমধ্যেই দানিউব অঞ্চলে ভ্রমণকারী পর্যটকদের ওপর পড়তে শুরু করেছে। এবারের গ্রীষ্মে পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় নদীভ্রমণ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেশ কিছু যাত্রা বাতিল করতে হয়েছে। কোথাও ভ্রমণপথ পরিবর্তন করা হয়েছে, কোথাও যাত্রীদের এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে স্থানান্তর করা হয়েছে। আবার নদীর যেসব অংশে নৌযান চলাচল সম্ভব হচ্ছে না, সেসব অংশ এড়িয়ে যেতে যাত্রীদের বাসে করে নিয়ে যেতে হচ্ছে। তবে নদীর এই পরিবর্তিত রূপ ভ্রমণকারীদের সামনে খুলে দিচ্ছে এক বিরল অভিজ্ঞতার দরজাও।

দানিউব নদী শুধু পথ দেখানোসহ ইতিহাসও শোনায়: প্রায় ২ হাজার ৮৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ দানিউব ইউরোপের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী। ১০টি দেশের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া এই নদী শুধু এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়ার জলপথ নয়, এর দুই তীরে ছড়িয়ে আছে শতাব্দীর পর শতাব্দীর ইতিহাস, সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন, যুদ্ধ, রাজনৈতিক পালাবদল, ফ্যাসিবাদ, কমিউনিজম ও স্বৈরশাসনের নানা অধ্যায়। সূত্র: বিবিসি।

কেএমএএ/আপ্র/৩১.০৮.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

হানি ট্র্যাপে অর্থ খোয়ানোসহ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন ভুক্তভোগীরা
৩১ আগস্ট ২০২৬

হানি ট্র্যাপে অর্থ খোয়ানোসহ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন ভুক্তভোগীরা

বর্তমান ডিজিটাল যুগে অপরাধের কৌশল যেমন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, তেমনি নতুন রূপে আবির্ভাব ঘটছে ‘হানি ট্...

মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি স্পর্শ
৩১ আগস্ট ২০২৬

মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি স্পর্শ

মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে স্পর্শ গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। জন্মের পর মাতৃক্রোড়ে শিশুর প্রথম আশ্রয় থেকে শুরু...

সন্তানের ‘কেন আমার বেলায় এমন হয়’ অভিযোগের সমাধান
৩১ আগস্ট ২০২৬

সন্তানের ‘কেন আমার বেলায় এমন হয়’ অভিযোগের সমাধান

জীবনটা অন্যদের জন্য যেন একটু সহজ। বন্ধুর হাতে নতুন ফোন, নিজেরটা পুরোনো। অঙ্কটা কঠিন। অথচ পাশের জন দি...

বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতির অনবদ্য অংশ তালের পিঠা-পায়েস
৩১ আগস্ট ২০২৬

বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতির অনবদ্য অংশ তালের পিঠা-পায়েস

তাল আমাদের দেশের অতি পরিচিত ফল। তাল যেমন নানাভাবে খাওয়া যায় তেমনি তালে পুষ্টিগুণও রয়েছে। পাকা তালের...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই