তারেক মাহমুদ, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি: লক্ষ্মীপুরে ঐতিহ্যবাহী গিগজ ধানের হাতে ভাজা মুড়ি শতবর্ষের শিল্প হিসেবে পরিচিত হলেও নানা সংকটে এখন তা বিলুপ্তির পথে। নারিকেল, সুপারি ও ইলিশের জন্য খ্যাত এ জেলায় গিগজ মুড়ি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় ঐতিহ্য ও অর্থনীতির অংশ হিসেবে টিকে থাকলেও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কাঁচামালের সংকট ও আধুনিক মেশিনে ভাজা মুড়ির প্রতিযোগিতায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে এ শিল্প।
জানা গেছে, প্রতি বছর জেলায় প্রায় ৫০০ টন হাতে ভাজা গিগজ মুড়ি উৎপাদিত হয়। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এ মুড়ি ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানিও হয় এ পণ্য। উদ্যোক্তাদের হিসাবে, এ শিল্পকে ঘিরে বছরে প্রায় ৮ কোটি টাকার লেনদেন হয়।
একসময় জেলায় এক হাজার টনেরও বেশি মুড়ি উৎপাদিত হতো, যা এখন অর্ধেকে নেমে এসেছে। বর্তমানে প্রতি কেজি মুড়ি উৎপাদক পর্যায়ে ১২০ থেকে ১৩০ টাকায় বিক্রি হলেও খুচরা বাজারে তা প্রায় ১৬০ টাকায় বিক্রি হয়। তবে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভ ক্রমশ কমে আসছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর, কমলনগর, রামগতি ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক পরিবার এখনও এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে সমসেরাবাদ, উত্তর মজুপুর, বেঁড়িরমাথা, করুনানগরসহ বিভিন্ন গ্রামে বহু পরিবার পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য ধরে রাখতে কষ্টসাধ্য এ কাজে নিয়োজিত রয়েছে।
সমসেরাবাদ এলাকার প্রবীণ উদ্যোক্তা বাবুল দাস প্রায় ৩০ বছর ধরে এ পেশায় যুক্ত। তিনি বলেন, এটি কেবল জীবিকা নয়, পারিবারিক ঐতিহ্যও। কিন্তু ধানের দাম বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় ও মেশিনে ভাজা মুড়ির আধিপত্যে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারি সহায়তা ছাড়া এ শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, কম দামের মেশিনে ভাজা মুড়ির কারণে হাতে ভাজা গিগজ মুড়ির বাজার সংকুচিত হচ্ছে। তবে স্বাদ ও মানের কারণে এখনও দেশ-বিদেশে এর চাহিদা রয়েছে। প্রবাসীরা বিদেশে যাওয়ার সময়ও এই মুড়ি সঙ্গে নিয়ে যান বলে জানা যায়।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের লক্ষ্মীপুর কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক মো. ফজলুল করিম বলেন, ক্ষুদ্র শিল্প উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। উদ্যোক্তারা প্রশিক্ষণ ও স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধার আওতায় আসতে পারবেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গিগজ ধানের চাষ পুনরুজ্জীবন, সহজ ঋণ সুবিধা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে লক্ষ্মীপুরের ঐতিহ্যবাহী হাতে ভাজা মুড়ির শিল্প ভবিষ্যতে ইতিহাসে পরিণত হতে পারে।
সানা/আপ্র/১৩/৫/২০২৬