দেশের চলমান জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে গভীর কূপ খনন কার্যক্রম নতুন আশার সঞ্চার করছে। প্রাথমিকভাবে দেশের চারটি গ্যাসক্ষেত্রের চারটি কূপে গভীর খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যেখানে সম্ভাব্য গ্যাস মজুত দেড় থেকে দুই ট্রিলিয়ন ঘনফুট হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, দেশে এতদিন সাধারণত সর্বোচ্চ চার হাজার মিটার গভীর পর্যন্ত কূপ খনন করা হলেও এবার সেই সীমা অতিক্রম করে ছয় হাজার মিটার পর্যন্ত যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে একটি কূপে গত ১৯ এপ্রিল খনন কাজ শুরু হয়েছে এবং বর্তমানে সেখানে পুরোদমে কাজ চলছে।
এই প্রকল্পের আওতায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস, কুমিল্লার বাখরাবাদ ও শ্রীকাইল এবং পাবনার সাঁথিয়ার মোবারকপুর এলাকায় গভীর কূপ খনন করা হবে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান, দেশে সাধারণত ২ হাজার ৬০০ থেকে ৪ হাজার মিটার গভীরতায় গ্যাস উত্তোলন করা হয় এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রায় ৪ হাজার ৯০০ মিটার পর্যন্ত খনন করা হয়েছে। তবে এর নিচে শক্ত শিলা স্তরের পরেও গ্যাস থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, যা ত্রিমাত্রিক জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
জরিপ অনুযায়ী, শ্রীকাইল এলাকায় প্রায় ৯২৬ বিলিয়ন ঘনফুট এবং তিতাসে প্রায় ১ হাজার ৫৮৩ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুত থাকতে পারে। সব মিলিয়ে সম্ভাব্য মজুত দেড় থেকে দুই ট্রিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি দুটি এবং বাপেক্স দুটি কূপ খনন করবে। এর মধ্যে তিতাস-৩১ ও বাখরাবাদ-১১ নম্বর কূপ খনন করবে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি এবং শ্রীকাইল ও মোবারকপুর কূপ খনন করবে বাপেক্স। সাম্প্রতিক সিসমিক জরিপে বড় ধরনের গ্যাস সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়ায় তিতাস-৩১ ও বাখরাবাদ-১১ কূপে প্রায় ৫ হাজার ৬০০ মিটার পর্যন্ত খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান এরফানুল হক বলেন, গভীর কূপ খনন ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সম্ভাবনা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এসব কূপে গ্যাস পাওয়া গেলে বর্তমান জ্বালানি সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। তিনি জানান, সংকট মোকাবিলায় ১৫০টি কূপ খনন ও পুনঃসংস্কারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ২৫টি কূপের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এসব কূপ থেকে সম্ভাব্য প্রতিদিন ২৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতে পারে এবং বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভোলায় আরো পাঁচটি নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, গ্যাস পাওয়া গেলে দেশের সংকট কিছুটা হলেও কমবে। তবে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাপেক্সকে শক্তিশালী করে তাদের মাধ্যমেই এসব কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত এবং প্রয়োজনে বিদেশি পরামর্শক নিয়োগ করা যেতে পারে, কিন্তু সরাসরি বিদেশি কোম্পানির ওপর নির্ভরতা ঠিক হবে না।
উল্লেখ্য, গত বছরের ৭ আগস্ট প্রথমবারের মতো গভীর কূপ খননের জন্য চীনা একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি। চুক্তি অনুযায়ী, তিতাস-৩১ কূপটি ৫ হাজার ৬০০ মিটার এবং বাখরাবাদ-১১ কূপটি ৪ হাজার ৩০০ মিটার পর্যন্ত খনন করা হবে। এ দুই কূপ খননে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৯৮ কোটি টাকা, যার মধ্যে সরকারি ঋণ ৫৫৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং কোম্পানির নিজস্ব অর্থায়ন ২৩৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা। প্রকল্পের বাস্তবায়ন মেয়াদ ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
পূর্ববর্তী ত্রিমাত্রিক সিসমিক জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাবনাময় এই কূপগুলো নির্বাচন করা হয়েছে। তিতাস ও বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রে অনাবিষ্কৃত উচ্চচাপ জোনের নিচে একাধিক স্তরে খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব কূপে চাপ প্রায় ১৫ হাজার পিএসআই এবং তাপমাত্রা প্রায় ৩৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইট হতে পারে, যা দেশের জন্য প্রথম উচ্চচাপ ও উচ্চ তাপমাত্রার কূপ হিসেবে বিবেচিত হবে।
পেট্রোবাংলা মনে করছে, নতুন স্তরে সফলভাবে খনন সম্পন্ন হলে দেশের গ্যাস খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে এবং গ্যাসের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
সানা/আপ্র/৬/৫/২০২৬