গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

মেনু

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর: শোক, প্রশ্ন আর অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির ভার

নিজেস্ব প্রতিবেদক

নিজেস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১১:৪৭ পিএম, ২১ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ১৭:৫৫ এএম ২০২৬
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর: শোক, প্রশ্ন আর অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির ভার
ছবি

ফাইল ছবি

উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের মর্মান্তিক ঘটনার এক বছর পূর্ণ হতে চলেছে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে ক্ষত শুকায়নি। সন্তান হারানোর শোক, দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে অনিশ্চয়তা, ঝুলে থাকা ক্ষতিপূরণ, তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়া এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে নিহত ও আহতদের পরিবার এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে গভীর বেদনা ও ক্ষোভ।

গত বছরের ২১ জুলাই দুপুরে উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি ভবনে বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হলে প্রাণ হারান অন্তত ৩৬ জন এবং আহত হন দেড় শতাধিক। নিহতদের বেশির ভাগই ছিল শিক্ষার্থী। মঙ্গলবার সেই ট্র্যাজেডির এক বছর পূর্ণ হচ্ছে।

শূন্য ঘর, অমলিন স্মৃতি
সন্তান হারানোর শোক আজও কাটিয়ে উঠতে পারেননি নিহত শিক্ষার্থী মাহতাব রহমান, তানভীর আহমেদ ও তাসনিম আফরোজ আয়মানের পরিবার।

মাহতাবের বাবা মিনহাজ রহমান জানান, ছেলের পড়ার টেবিল, বই-খাতা, সবকিছু এক বছর ধরেই আগের মতো সাজানো আছে। তাঁর ভাষায়, “আগে আমাদের বাসা ছিল হাসি-আনন্দে ভরা, এখন যেন কবরস্থানের মতো নীরব। মাহতাবের মা আজও ছেলের কাপড় বুকে জড়িয়ে কাঁদেন।”

তানভীর আহমেদের বাবা রুবেল মিয়া বলেন, যেদিন সকালে তিনি ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দিয়েছিলেন, সেদিনই দুপুরে তাকে লাশ হয়ে ফিরে পেতে হয়েছে। এখন ছোট ছেলেকে স্কুলে নিয়ে গেলেও শত শত শিক্ষার্থীর ভিড়ে তিনি বড় ছেলেকে খুঁজে বেড়ান।

দগ্ধ হয়ে চার দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ের পর মারা যাওয়া তাসনিম আফরোজ আয়মানের মা আয়েশা আক্তার বলেন, মেয়ের ব্যবহৃত পোশাক, খাতা, খেলনা—সবকিছু আজও আগের জায়গাতেই রাখা আছে। দুর্ঘটনার পর থেকে তারা আর উত্তরার সেই বাসায় ফিরে যাননি।

নিরাপত্তা নিয়ে এখনো উদ্বেগ
দুর্ঘটনার এক বছর পরও সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা কাটেনি অভিভাবকদের।

রুবেল মিয়ার অভিযোগ, দুর্ঘটনার পরও এলাকায় বিমান চলাচল নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক রয়ে গেছে। তাঁর ভাষায়, “আমরা সবসময় ভয়ে থাকি—না জানি আবার এমন কোনো ঘটনা ঘটে যায়।”

তবে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল নুরুন নবী বলেন, দুর্ঘটনার পর ওই এলাকায় প্রশিক্ষণ উড্ডয়ন আর হচ্ছে না। প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে যে যুদ্ধবিমান দেখা যায়, তা নগর নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব পালনের অংশ বলে তিনি জানান।

তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি
দুর্ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিলেও তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহতদের স্বজনরা।

তানভীরের বাবা রুবেল মিয়া বলেন, তদন্তে ভবনের নকশাগত ত্রুটি ও উড্ডয়নের ত্রুটির কথা উল্লেখ করা হলেও পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তাঁদের সামনে প্রকাশ করা হয়নি।

একই দাবি মাহতাবের বাবারও। তিনি বলেন, কী কারণে দুর্ঘটনা ঘটল, কার দায় ছিল এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে এখনো জানানো হয়নি।

পরিবারগুলোর দাবি, তদন্ত প্রতিবেদন পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশ করে দায় নির্ধারণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

ক্ষতিপূরণ এখনো অমীমাংসিত
দুর্ঘটনার পর নিহতদের পরিবারকে ২০ লাখ এবং আহতদের পাঁচ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তার সিদ্ধান্ত হলেও এখনো কেউ সেই অর্থ গ্রহণ করেননি।

অভিভাবকদের মতে, এ অর্থ ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় অপ্রতুল। গুরুতর আহত অনেক শিক্ষার্থীর চিকিৎসা ব্যয়ই এর কয়েক গুণ বেশি।

আয়মানের মা বলেন, “টাকা দিয়ে আমার সন্তানকে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। তাই আমরা কোনো অর্থ গ্রহণ করিনি।”

আহত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সংগঠনও জানিয়েছে, তারা উচ্চ আদালতে করা রিটের আলোকে ক্ষতিপূরণ ও অন্যান্য সুপারিশ বাস্তবায়ন চান। তাঁদের অভিযোগ, নতুন সরকারও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

সাবেক পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের নির্ধারিত ক্ষতিপূরণের অঙ্ক ভুক্তভোগী পরিবারগুলো গ্রহণ না করায় বিষয়টি অমীমাংসিত থেকে যায়। নতুন সরকার এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা তাঁর জানা নেই।

ভেঙে ফেলা হচ্ছে দুর্ঘটনাকবলিত ভবন
দুর্ঘটনার এক বছর পূর্তির আগেই বিমান বিধ্বস্ত হওয়া ভবনটি ভেঙে ফেলার কাজ শুরু হয়েছে। রাজউকের নির্দেশনা অনুযায়ী ভবনটি অপসারণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ।

তবে নিহতদের স্মৃতি কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল নুরুন নবী বলেন, স্মৃতি সংরক্ষণের বিষয়ে তাঁদের আগ্রহ রয়েছে, তবে কীভাবে তা করা হবে, সে বিষয়ে এখনো পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়নি।

অন্যদিকে নিহত তানভীরের বাবা রুবেল মিয়া চান, দুর্ঘটনাস্থলে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নয়, বরং একটি আধুনিক মসজিদ নির্মাণ করা হোক, যাতে স্বজনরা সেখানে এসে সন্তানদের জন্য দোয়া করতে পারেন।

এক বছরের অপেক্ষা, উত্তরহীন প্রশ্ন

দুর্ঘটনার এক বছর পরও নিহত ও আহতদের পরিবারগুলোর প্রধান দাবি একই—তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা, নিরাপদ শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করা, ক্ষতিপূরণ নিয়ে ন্যায়সংগত সমাধান এবং ভবিষ্যতে যেন আর কোনো পরিবারকে এমন শোক বয়ে বেড়াতে না হয়, সেই নিশ্চয়তা।
সানা/আপ্র/২১/৭/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

৩০ জুলাই সারা দেশে সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধের ঘোষণা
২১ জুলাই ২০২৬

৩০ জুলাই সারা দেশে সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধের ঘোষণা

কমপ্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস (সিএনজি) বিক্রিতে কমিশন বাড়ানোর দাবিতে ৩০ জুলাই ভোর ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন...

দুর্যোগে মানবিক সহায়তাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব: জুবাইদা রহমান
২১ জুলাই ২০২৬

দুর্যোগে মানবিক সহায়তাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব: জুবাইদা রহমান

জাতীয় দুর্যোগ ও সংকটের সময় রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জা...

৮ ঘণ্টা পর স্বাভাবিক রাজশাহীর রেল
২১ জুলাই ২০২৬

৮ ঘণ্টা পর স্বাভাবিক রাজশাহীর রেল

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) এক শিক্ষার্থীকে ট্রেনে মারধরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের রেল...

চালু হলো 'হ্যালো ডিসি' অ্যাপ, এক ক্লিকেই মিলবে জেলা প্রশাসনের সেবা
২১ জুলাই ২০২৬

চালু হলো 'হ্যালো ডিসি' অ্যাপ, এক ক্লিকেই মিলবে জেলা প্রশাসনের সেবা

ঢাকা জেলা প্রশাসনের সেবাকে আরো সহজ, দ্রুত ও জনবান্ধব করতে চালু হয়েছে 'হ্যালো ডিসি' মোবাইল অ্যাপ। এর...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই