কখনো কখনো একটি নতুন জামা শুধু কাপড় নয়—তা হয়ে ওঠে এক শিশুর স্বপ্ন, একফোঁটা আনন্দ, একটুকরো ঈদ। আর সেই ছোট্ট আনন্দই যখন ছড়িয়ে পড়ে শত মুখে, তখন তা রূপ নেয় এক অনির্বচনীয় মানবিক উৎসবে।
গাজীপুরের জয়দেবপুর রেলস্টেশন এলাকার ব্যস্ততার ভিড়ে এমনই এক ভিন্ন দৃশ্যের জন্ম দিলেন আল মামুন। ১০০ জন এতিম, দুস্থ ও পথশিশুকে নিয়ে আয়োজন করলেন ইফতার মাহফিল ও ঈদের পোশাক বিতরণ। তবে এটি ছিল না শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা—এটি ছিল ভালোবাসার নিঃশব্দ ভাষা, হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা এক মানবিক অঙ্গীকার।
ইফতারের আগে যখন শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছিল নতুন পোশাক, তখন সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল। কারো চোখে বিস্ময়ের ঝিলিক, কারো মুখে চাপা হাসি, আবার কেউবা নতুন জামা বুকে জড়িয়ে ধরছিল নিজের সমস্ত সুখের মতো করে। সেই মুহূর্তগুলোয় বোঝা যাচ্ছিল—এক জোড়া নতুন জামা সত্যিই একটি পুরো পৃথিবী আনন্দ হয়ে উঠতে পারে।
এই আলোর গল্পের পেছনে আছে এক অন্ধকার অতীত। ২০১৭ সালে পিতাকে হারিয়ে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন আল মামুন। অভাব, কষ্ট আর অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়েই তাকে গড়ে তুলেছে সময়। কিন্তু সেই কষ্ট তাকে কঠিন করেনি—বরং করেছে কোমল, করেছে মানবিক।
অদম্য পরিশ্রম আর দৃঢ় সংকল্পে ২০১৯ সালে তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। বর্তমানে সমাজসেবা অধিদফতরের একজন দায়িত্বশীল কর্মচারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি একজন সফল মোবাইল ইমপোর্টার ব্যবসায়ী হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কিন্তু তার পরিচয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিকটি হয়তো অন্যখানে—তিনি একজন মানুষ, যিনি নিজের না-পাওয়া সুখ অন্যের মাঝে বিলিয়ে দিতে জানেন।
অনুষ্ঠানে আবেগভরা কণ্ঠে আল মামুন বলেন,“আমি নিজে পিতৃহারা হয়ে অভাব ও কষ্টের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছি। আমি জানি এক জোড়া নতুন কাপড় বা একবেলা ভালো খাবারের আনন্দ এই শিশুদের কাছে কতটা মূল্যবান। আজ তাদের সাথে ইফতার করতে পেরে এবং তাদের হাসিমুখ দেখে আমি যে তৃপ্তি পেয়েছি, তা অন্য কোনো সাফল্যে নেই।”
তার কথাগুলো ছিল না কোনো বক্তৃতা—ছিল জীবনের গভীর থেকে উঠে আসা সত্যের প্রতিধ্বনি।
তিনি আরো বলেন,“আমি চাই এ ধরনের কাজ বারবার নয়, বহুবার করতে। যদি এই শিশুদের মুখে আজীবন হাসি ধরে রাখতে পারি, তবেই নিজেকে প্রকৃত সফল মানুষ মনে করব।”
এই আয়োজন যেন এক নীরব বার্তা ছড়িয়ে দিলো চারদিকে—মানুষ মানুষের জন্য, এই সত্য এখনো বেঁচে আছে। স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ তার এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং সমাজের অন্য বিত্তবানদেরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
শেষে শিশুদের নিয়ে দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে ইফতার মাহফিল শেষ হয়। কিন্তু শেষ হয় না সেই অনুভূতি—যে অনুভূতি মনে করিয়ে দেয়, সুখের সংজ্ঞা খুব বড় কিছু নয়; কখনো কখনো তা একটি নতুন জামা, একটি হাসি, অথবা কারো পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।
আজ যখন পৃথিবী ব্যস্ত নিজের হিসাব-নিকাশে, তখন আল মামুনদের মতো মানুষরা নিঃশব্দে লিখে যাচ্ছেন অন্যরকম এক গল্প—মানবিকতার, সহমর্মিতার, আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার।
হয়তো আমরা সবাই বড় কিছু করতে পারব না।কিন্তু আমরা চাইলে—একটি শিশুর ঈদকে আনন্দময় করতে পারি, একটি মুখে হাসি ফোটাতে পারি।
কারণ, শেষ পর্যন্ত—এক জোড়া নতুন জামাই কখনো কখনো হয়ে ওঠে এক পৃথিবী আনন্দ।
সানা/এসি/আপ্র/১৯/৩/২০২৬