রাজধানী ঢাকায় মশার উপদ্রব আবারো উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, মশার লার্ভা ও প্রাপ্তবয়স্ক মশার সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে মার্চ মাসে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে। একটি সংবাদসংস্থা এক প্রতিবেদনে বিস্তারিত তুলে ধরেছে।
রাজধানীর গুলশান এক নম্বরের চব্বিশ নম্বর সড়কের বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনেই এর প্রভাব স্পষ্ট। সড়কের দুই পাশে নান্দনিক নকশার ভবন, সামনে সাজানো বাগান, চেয়ার ও ছোট টেবিল-সব মিলিয়ে অবসর কাটানোর সুন্দর পরিবেশ। সকাল বা বিকেলে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অনেকেই বারান্দায় সময় কাটান।
কিন্তু সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই বদলে যায় দৃশ্য। সূর্যাস্তের আগেই চারদিক থেকে মশার ঝাঁক আক্রমণ শুরু করলে বাসিন্দারা দ্রুত ঘরের ভেতরে চলে যান। দরজা-জানালা বন্ধ করে রাত কাটাতে বাধ্য হন তারা।
গুলশানের বাসিন্দা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন সন্ধ্যায় মৌমাছির মতো মশা হামলে পড়ে। হাত-পা নাড়ালেও কাজ হয় না, মুহূর্তের মধ্যে কামড়াতে থাকে। তাই সন্ধ্যার পর আর বারান্দায় বসা যায় না।
ধনী-গরিব সবার ভোগান্তি: গুলশানের পাশেই বনানী লেকের পশ্চিমে কড়াইল বস্তি। সেখানে প্রায় চার লাখ নিম্নআয়ের মানুষের বাস। বেশির ভাগ ঘরই টিনের তৈরি। দরজা-জানালা বন্ধ করলেও ফাঁকফোকর দিয়ে মশা ঢুকে পড়ে। বস্তির বাসিন্দা হান্নান মিয়া বলেন, গুলশান-বনানী লেকই মশার বড় প্রজননস্থল। এখানকার মশা ধনী-গরিব কাউকে ছাড়ে না। সন্ধ্যা হলেই ঝাঁকে ঝাঁকে বাসাবাড়িতে ঢুকে পড়ে।
তার অভিযোগ, “দিনের বেলাতেও মশারি টানিয়ে ঘুমাতে হয়। অথচ গুলশানেই উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান কার্যালয়। এখানেই যদি এমন অবস্থা হয়, তাহলে পুরো শহরের অবস্থা কেমন তা সহজেই বোঝা যায়।”
তিন ধরনের মশার বিস্তার: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকায় সাধারণত তিন ধরনের মশা বেশি দেখা যায়-কিউলেক্স, এডিস ও অ্যানোফিলিস। শুষ্ক মৌসুমে তাপমাত্রা দ্রুত বাড়া, নর্দমা ও জলাশয়ের দূষণ এবং জমে থাকা পানির কারণে কিউলেক্স মশা দ্রুত বাড়ে। তাপমাত্রা বাড়লে এ মশার জীবনচক্র দ্রুত সম্পন্ন হয় এবং স্ত্রী মশার রক্তপানের প্রবণতাও বাড়ে। ফলে ডিম উৎপাদন ও বিস্তার দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ বাড়ে। এ ছাড়া অ্যানোফিলিস মশার মাধ্যমে ম্যালেরিয়া ছড়ানোর আশঙ্কাও থাকে।
গবেষণায় উদ্বেগজনক চিত্র: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর ধরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মশা নিয়ে গবেষণা করছেন। সাম্প্রতিক এক জরিপে তার দল মশার লার্ভা এবং প্রাপ্তবয়স্ক মশার উপস্থিতি বিশ্লেষণ করে উদ্বেগজনক তথ্য পেয়েছে।
লার্ভার ঘনত্ব নির্ধারণ করতে বিভিন্ন জলাশয় থেকে দুই শত পঞ্চাশ মিলিলিটার পানি সংগ্রহ করে তাতে লার্ভার সংখ্যা গণনা করা হয়। জানুয়ারিতে ঢাকা ও সাভারের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগৃহীত পানিতে গড়ে আটশ পঞ্চাশটি লার্ভা পাওয়া যায়। ফেব্রুয়ারিতে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় গড়ে এক হাজার দুইশ পঞ্চাশে।
প্রাপ্তবয়স্ক মশার উপস্থিতি যাচাইয়ের পদ্ধতিও ভিন্ন। একজন মানুষের হাঁটু পর্যন্ত পা ও বাহু উন্মুক্ত রেখে এক ঘণ্টায় কতটি মশা কামড়াতে আসে তা গণনা করা হয়। জানুয়ারিতে এই সংখ্যা ছিল চারশ থেকে সর্বোচ্চ ছয়শ। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে গড়ে আটশ পঞ্চাশে পৌঁছেছে। অধ্যাপক বাশার বলেন, “বিশ্বমান অনুযায়ী এক ঘণ্টায় পাঁচটি মশা কামড়াতে এলেও তা বেশি বলে ধরা হয়। সেখানে ঢাকায় আটশ পঞ্চাশটি মশা কামড়াতে আসা কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি স্পষ্ট বিপৎসংকেত।” তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, মার্চ মাসে এই প্রবণতা আরো বাড়তে পারে।
বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ: কীটতত্ত্ববিদদের মতে, পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে ড্রেন ও নর্দমায় পানি জমে থাকে, যা মশার বংশবিস্তার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে। একই সঙ্গে শীত শেষে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়াও মশা বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে।
অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় সরকার কাঠামোর কার্যক্রমেও কিছুটা স্থবিরতা দেখা গেছে। জাতীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক ব্যস্ততার কারণে অনেক ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের তদারকি কমে যায়। আগে প্রতিটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর ও জনপ্রতিনিধিরা সরাসরি এসব বিষয় তদারকি করতেন। তাদের সক্রিয়তার ঘাটতির ফলে মশক নিধনের শৃঙ্খলও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
নগরজুড়ে বিস্তৃত সমস্যা: ঢাকা মহানগরে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পঁচাত্তরটি ওয়ার্ড এবং উত্তর সিটি করপোরেশনের চুয়ান্নটি ওয়ার্ড রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী এখানে প্রায় এক কোটি তিন লাখ মানুষ বসবাস করে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাবে ঢাকার জনসংখ্যা প্রায় তিন কোটি ছেষট্টি লাখ।
এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে মশার কবল থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব দুই সিটি করপোরেশনের। নিয়ম অনুযায়ী সকালে ড্রেন, নালা, ঝিল বা খালে লার্ভা ধ্বংসকারী ওষুধ এবং বিকেলে প্রাপ্তবয়স্ক মশা নিধনের ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু তবুও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় প্রশ্ন উঠছে কার্যকারিতা নিয়ে।
প্রশাসনের নতুন উদ্যোগ: সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বছরের আগস্টের আগে মশক নিধন কার্যক্রম তদারকি করতেন মেয়র ও কাউন্সিলররা। পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অনেক ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের জবাবদিহি কমে যায়।
এর মধ্যে সম্প্রতি দুই সিটি করপোরেশনেই নতুন প্রশাসক দায়িত্ব নিয়েছেন। দক্ষিণ সিটিতে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন আবদুস সালাম এবং উত্তরে শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। দায়িত্ব নেওয়ার পর তারা মশা নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার কর্মসূচি হিসেবে ঘোষণা করেছেন। উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক দায়িত্ব গ্রহণের পর মিরপুরে মশক নিধন ওষুধ সংরক্ষণাগার পরিদর্শন করেন এবং ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা করেন। পরে কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেন, শুধু ওষুধ ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এজন্য সামাজিক সচেতনতা ও নিয়মিত তদারকি বাড়াতে হবে।
নাগরিকদের অভিযোগ: উত্তরার বাসিন্দা সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ঢাকার মধ্যে সম্ভবত উত্তরাতেই সবচেয়ে বেশি মশার উপদ্রব। এখানে অসংখ্য লেক ও জলাশয় রয়েছে, কিন্তু সেগুলোতে নিয়মিত ওষুধ প্রয়োগ করা হয় না। ফলে সারা বছরই মশার উপদ্রব থাকে।
দক্ষিণ ঢাকার শ্যামপুরের বাসিন্দা আকরাম হোসেনের অভিযোগ, ওই এলাকায় মাসে একবারও মশা নিধনের ওষুধ ছিটাতে দেখা যায় না। মশার কামড়ে ঘরে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে, শিশুদেরও দিন-রাত ঘরের ভেতরে রাখতে হচ্ছে। গুলশান সোসাইটির সভাপতি ওমর সাদাত বলেন, মশার উপদ্রব ঢাকার সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার এক অস্বস্তিকর চিত্র। কয়েল, অ্যারোসল কিংবা মশারি-কোনো কিছুতেই মশার আক্রমণ পুরোপুরি ঠেকানো যাচ্ছে না। তিনি মনে করেন, মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনকে আরো কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
সিটি করপোরেশনের বক্তব্য: ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান বলেন, মশা নিধনে তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছেন। এ কার্যক্রমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগকেও যুক্ত করা হয়েছে যাতে ডোবা ও নালায় জমে থাকা ময়লায় মশা জন্মাতে না পারে। তবে তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনের একার পক্ষে মশা নিধন সম্ভব নয়। নাগরিকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। যার জমিতে ডোবা বা পানি জমে আছে, সেখানে যেন মশার প্রজনন না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া রাজধানীতে মশার এই বাড়ন্ত প্রকোপ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
সানা/আপ্র/১০/৩/২০২৬