গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬

মেনু

তিন শতাব্দী পর নতুনরূপে ফিরেছে সাজগোজের টেবিল

লাইফস্টাইল ডেস্ক

লাইফস্টাইল ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:১৩ পিএম, ১৭ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ২০:০৫ এএম ২০২৬
তিন শতাব্দী পর নতুনরূপে ফিরেছে সাজগোজের টেবিল
ছবি

ছবি সংগৃহীত

এক সময় ভ্যানিটি বা সাজের টেবিল ছিল শুধু সৌন্দর্যচর্চার আসবাব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা, এমনকি রাজনীতির গল্পও। প্রায় তিন শতাব্দী আগে ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে মাদাম দ্য পম্পাদুরের সাজের টেবিল ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও রাষ্ট্রদূতদের ভিড় এরই প্রমাণ।

সময়টা ১৭৪৮ সাল। ভয়াবহ এক মহাদেশীয় যুদ্ধের পর ইউরোপ তখন রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্রাজ্যের ভাগ-বাঁটোয়ারা, সীমান্ত পুনর্নির্ধারণ সব মিলিয়ে অস্থির সময়। সেই ডিসেম্বরের এক দিনে ভার্সাই প্রাসাদের ভেতরে দেখা গেল দীর্ঘ এক সারি মানুষের অপেক্ষা। ওই ভিড় ছিল না রাজার কক্ষের সামনে, এমনকি তার মন্ত্রীদের কক্ষের সামনেও নয়। সভাসদ, রাষ্ট্রদূত, অর্থলগ্নিকারী ও অভিজাতরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছিলেন এমন এক নারীর কক্ষের সামনে, যার কোনও আনুষ্ঠানিক সরকারি পদ ছিল না। কারও হাতে ছিল আবেদনপত্র, কেউ আবার আগে থেকেই নিজের বক্তব্য বা যুক্তি সাজিয়ে নিচ্ছিলেন।

সবুজ রেশম ও ড্যামাস্ক কাপড়ে সাজানো ওই কক্ষে বসে ছিলেন মাদাম দ্য পম্পাদুর। রাজা পঞ্চদশ লুইয়ের ঘনিষ্ঠ এই নারী তখন রাজদরবারে ক্রমেই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। তিনি বসেছিলেন তার তোয়ালেত অর্থাৎ সাজের টেবিলে। পরিচারিকারা তার মুখে পাউডার ও রুজ লাগাচ্ছিলেন। এর পাশাপাশি যত্ন নিচ্ছিলেন তার চুলের।

১৭৪৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর ফ্রান্সের সাবেক এক রাষ্ট্রসচিব ডায়েরিতে লিখেছিলেন, তার প্রস্তুতি শুরু হওয়ার অপেক্ষায় একবার ভিড় সিঁড়ির একেবারে নিচ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। মাদাম দ্য পম্পাদুর-বিষয়ক গবেষক ও নিউ হ্যাম্পশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্প-ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক সুসান ওয়াগারের সংগৃহীত তথ্যেও এই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।

ড্রেসিং টেবিলটির জন্য এবার রাজার কোনো উপপত্নী আগ্রহ দেখাচ্ছেন না; বরং মাত্র পাঁচ-ছয় বছর বয়সি শিশুরাও ভ্যানিটি চাইছে। এরই একটি উদাহরণ নিউ জার্সির ছোট্ট জোহানা মোয়া। পাঁচ বছর বয়স থেকেই সে মা-বাবার কাছে বারবার একটি ভ্যানিটি চাওয়া শুরু করে। নিজের হাতখরচের টাকা জমিয়ে সে ওই ভ্যানিটি কেনার প্রস্তুতি নেয়। খেলনা গুছিয়ে রাখা, গাছে পানি দেওয়া কিংবা একটি বই পড়ে শেষ করার বিনিময়ে পাওয়া টাকা জমাত সে। শেষ পর্যন্ত ষষ্ঠ জন্মদিনের আগেই তার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়। জোহানা পায় উজ্জ্বল গোলাপি রঙের একটি ভ্যানিটি, যার সঙ্গে ছিল আলাদা আলাদা জিনিস রাখার জায়গা এবং চারপাশে আলো লাগানো ডিম্বাকৃতির আয়না। তবে ভ্যানিটিটি শুধু সাজগোজের জন্য নয়। সেখানে বসে জোহানা বাড়ির কাজ করে, ডায়েরি লেখে, চুল আঁচড়ায় এবং ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করে। সবচেয়ে বেশি উপভোগ করে ‘গেট রেডি উইথ মি’ ধরনের খেলা।

অবশ্য জোহানার ভ্যানিটির সঙ্গে ভার্সাই প্রাসাদের বিলাসবহুল ভ্যানিটির পার্থক্য আকাশ-পাতাল। একসময়কার অভিজাত ভ্যানিটি তৈরি হতো দামি কাঠ ও ব্রোঞ্জের কারুকাজে। জোহানারটি তৈরি হয়েছে কারখানায় তৈরি কাঠ দিয়ে, স্ক্রু ও ডাওয়েল দিয়ে জোড়া লাগানো হয়েছে এবং কার্ডবোর্ডের বাক্সে করে পৌঁছেছে ওয়েফেয়ার থেকে। দাম ছিল ১২৯ দশমিক ৯৯ ডলার।

বর্তমানে ওয়ালমার্ট, আইকিয়া, টার্গেট, ওয়েস্ট এলম, আরবান আউটফিটার্সসহ বিভিন্ন বিক্রেতার কাছে একই ধরনের অসংখ্য ভ্যানিটি পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ একসময় রাজপ্রাসাদের বিলাসিতার প্রতীক থাকা এই আসবাব এখন সাধারণ পরিবারের ঘরেও জায়গা করে নিচ্ছে।

পিন্টারেস্টের তথ্যও ভ্যানিটির নতুন করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত এক বছরে ‘আধুনিক শোবার ঘরের ভ্যানিটি’ খোঁজার হার বেড়েছে ৭৪১ শতাংশ। ‘সর্বশেষ ড্রেসিং টেবিল’ খোঁজার হার বেড়েছে ৬৬২ শতাংশ এবং ‘শোয়ার ঘরের ভ্যানিটি টেবিল’ খোঁজার হার বেড়েছে ২৯৮ শতাংশ। তবে এর পেছনে শুধু আসবাব কেনার আগ্রহই কাজ করছে না। জোহানার মতো অনেকের কাছে ভ্যানিটি হলো অনলাইনে দেখা ‘গেট রেডি উইথ মি’ সংস্কৃতিকে নিজের মতো করে উপভোগ করার একটি জায়গা। আর সাজগোজ করে নিজেকে প্রস্তুত করার এই রীতি আসলে ভ্যানিটির চেয়েও অনেক পুরোনো।

ভ্যানিটির ইতিহাসের শুরু হয়েছিল টেবিল দিয়ে নয়, একটি বাক্স দিয়ে। প্রাচীন মিশরে নারীরা প্রসাধনী রাখার জন্য কাঠের বাক্স ব্যবহার করতেন। পরে ফরাসিরা এই আসবাবের পাশাপাশি সাজগোজের পুরো প্রক্রিয়ারও একটি নাম দেয় তোয়ালেত। শব্দটির উৎপত্তি তোয়াল থেকে। নারীর ব্রাশ, চিরুনি ও প্রসাধনী সাজানোর আগে টেবিলের ওপর যে কাপড় বিছানো হতো, সেটিকেই বলা হতো তোয়াল। সময়ের সঙ্গে তোয়ালেত শুধু একটি আসবাব নয়, নিজেকে সাজিয়ে তোলার পুরো প্রক্রিয়ার নাম হয়ে ওঠে।

মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্টের ২০১৩ সালের ভ্যানিটি বিষয়ক প্রদর্শনীর কিউরেটর জেন অ্যাডলিনের ভাষায়- ‘এটি একটি বস্তু থেকে ধীরে ধীরে একটি প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে।’ ১৮শ’ শতকে মাদাম দ্য পম্পাদুরের হাত ধরে সাজগোজের এই রীতি ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হলেও শিল্পবিপ্লবের পর ভ্যানিটি ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের নাগালে চলে আসে। ১৯৫০-এর দশকে এটি আইকিয়ার ক্যাটালগেও নিয়মিত দেখা যেত। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকে এসে পরিস্থিতি বদলে যায়। আইকিয়াসহ বিভিন্ন বিক্রেতার কাছ থেকে ভ্যানিটি প্রায় হারিয়ে যায়।

ফ্লোরিডার ২০ বছর বয়সি শিল্পকলার শিক্ষার্থী মিশেল ফান একটি জেভিসি ক্যামকর্ডার দিয়ে নিজের মেকআপ করার ভিডিও ধারণ করে ইউটিউবে পোস্ট করতে শুরু করেন। তিনিই প্রথম সৌন্দর্যবিষয়ক ভিডিও নির্মাতা ছিলেন না। কিন্তু তার ভিডিও দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং তিনি ইউটিউবের অন্যতম পরিচিত বিউটি গুরুতে পরিণত হন। ফলে যে রীতি এক সময় ছিল একান্ত ব্যক্তিগত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হাত ধরে সেটিই হয়ে ওঠে দর্শনীয় এক অভিজ্ঞতা। আর ওই পরিবর্তনের হাত ধরেই হয়তো ভ্যানিটি আবার ফিরছে- এবার রাজদরবারে নয়, বরং আধুনিক শোয়ার ঘর, শিশুদের কক্ষ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সংস্কৃতিতে। সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইম।

কেএমএএ/আপ্র/১৭.০৮.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

মানুষের পাশে না থাকা সামাজিক ও মানসিকসহ নৈতিকতার সংকট
১৭ আগস্ট ২০২৬

মানুষের পাশে না থাকা সামাজিক ও মানসিকসহ নৈতিকতার সংকট

বিপদের সময় মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সব সময় টাকা নয়; কখনো একটি ফোনকল, কখনো একটি দরজায় কড়া নাড়া, কখনো...

প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য আর মন জুড়ানো ‘ঋতুরানি’ শরৎকাল
১৭ আগস্ট ২০২৬

প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য আর মন জুড়ানো ‘ঋতুরানি’ শরৎকাল

ভাদ্র মানেই পলিমাটির এই বাংলায় শরতের স্নিগ্ধ ও রূপসী কন্যার মনমাতানো আগমন। বর্ষার একটানা ভারী বর্ষণ...

ক্যামেরার লেন্সে জীবন দেখায় হারাচ্ছে আসল স্মৃতিগুলোই
১৭ আগস্ট ২০২৬

ক্যামেরার লেন্সে জীবন দেখায় হারাচ্ছে আসল স্মৃতিগুলোই

আমাদের ফোনের গ্যালারিটা খুললেই চোখে পড়ে রাশি রাশি ছবির মেলা। কোথাও ঘুরতে গেলে পাহাড়, সমুদ্র, সূর্যাস...

প্রতিদিনের নাস্তায় ঝামেলাহীন স্বাদে বৈচিত্র্য আনতে তিন পদ
১৭ আগস্ট ২০২৬

প্রতিদিনের নাস্তায় ঝামেলাহীন স্বাদে বৈচিত্র্য আনতে তিন পদ

সকালের নাস্তা দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাবার। তবে ব্যস্ততার কারণে অনেকেই প্রতিদিন একই ধরনের নাস্তা...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

বিএনপি সরকারের ছয় মাস: প্রত্যাশা কতটা, প্রাপ্তি কতখানি

আজ ১৭ আগস্ট সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হচ্ছে। এর আগে ছয় মাসের কাজের মূল্যায়নে সরকার যেমন বেশ কিছু অর্জনের কথা বলছে, তেমনি বিরোধী রাজনৈতিক দল, অর্থনীতিবিদ ও বিভিন্ন পর্যায়ের নাগরিকদের প্রশ্নও সামনে এসেছে। সরকারের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দাবি করেছেন, ছয় মাসের লক্ষ্য অনুযায়ী মোটামুটি সব কর্মসূচিই পূরণ হয়েছে-কোথাও ৯০, কোথাও ৯৫ এবং কোথাও শতভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে। প্রিয় পাঠক, সরকার ভালো করছে নাকি মন্দ করছে? হ্যাঁ বা না জানান।

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 17 ঘন্টা আগে