বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৬০টি বাণিজ্য অংশীদার দেশের পণ্যের ওপর নতুন আমদানি শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। পণ্য উৎপাদনে ‘জোরপূর্বক শ্রম’ বন্ধে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগে দেশভেদে ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত এই শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য নতুন শুল্কহার রাখা হয়েছে ১০ শতাংশ।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের শুরুতে আরোপিত ১০ শতাংশের সাময়িক বৈশ্বিক শুল্কের মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুক্রবার থেকে নতুন শুল্ক কার্যকর হয়েছে। তবে কার্যকর হওয়ার আগে যেসব পণ্য পরিবহনে ছিল, সেগুলো ২৮ জুলাই পর্যন্ত নতুন শুল্কের আওতার বাইরে থাকবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সুপ্রিম কোর্টের আইনি বাধার পর বিকল্প আইনি কাঠামোর মাধ্যমে এই নতুন শুল্কব্যবস্থা কার্যকর করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মোট আমদানিকৃত প্রায় ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে নতুন শুল্কহার প্রযোজ্য হবে।
কোন দেশের ওপর কত শুল্ক
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরের ঘোষণায় বলা হয়েছে, যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য আমদানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে, দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে অথবা আংশিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তাদের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
এই তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, গুয়াতেমালা, এল সালভেদর, হন্ডুরাস, ইকুয়েডর, জর্ডান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং ত্রিনিদাদ ও টোবাগো।
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, তাইওয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সুইজারল্যান্ডের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সুবিধাপ্রাপ্ত বাণিজ্য হার সমন্বয় করে মোট ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া জোরপূর্বক শ্রম প্রতিরোধে পর্যাপ্ত আইনি কাঠামো গড়ে তুলতে ব্যর্থ বলে বিবেচিত তদন্তাধীন ৩৮টি দেশের পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে চীন ও ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশ।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেন, প্রায় এক শতাব্দী ধরে যুক্তরাষ্ট্র জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করে আসছে। এখন সময় এসেছে, বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোও একই ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। তাঁর দাবি, নতুন শুল্ক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতাগত বৈষম্য কমাতে এবং শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় সহায়ক হবে।
যেসব পণ্য শুল্কমুক্ত
মূল্যস্ফীতির চাপ কম রাখতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যকে নতুন শুল্কের বাইরে রাখা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—
* অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস
* কৃষি সার ও নির্দিষ্ট খাদ্যপণ্য
* উড়োজাহাজ ও এর যন্ত্রাংশ
* জরুরি খনিজ উপাদান
* আগে থেকেই বিশেষ বিধানের আওতায় থাকা স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও মোটরযান
* উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির শর্ত পূরণকারী পণ্য
আইনি প্রেক্ষাপট
চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা বৈশ্বিক শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করে। এরপর প্রশাসন ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের সংশ্লিষ্ট বিধান প্রয়োগ করে নতুন আইনি ভিত্তিতে শুল্কনীতি কার্যকর করে।
এর আগে ২০২৫ সালের এপ্রিলে তথাকথিত ‘লিবারেশন ডে’ উপলক্ষে বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করলে প্রশাসনকে বিপুল অঙ্কের অর্থ ফেরত দিতে হয়। এরপর থেকেই বিকল্প উপায়ে নতুন শুল্ক আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে বিভিন্ন দেশ।
ব্রাজিল সরকার এ শুল্ককে ‘অন্যায্য ও স্বেচ্ছাচারী’ উল্লেখ করে বলেছে, শ্রমিক অধিকারের বিষয়কে যুক্তরাষ্ট্র সংরক্ষণবাদী বাণিজ্যনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। দেশটি পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া এবং বিকল্প বাজার খোঁজার ঘোষণা দিয়েছে।
জাপান সরকার গভীর হতাশা প্রকাশ করে বলেছে, তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সব নিয়ম মেনেই কার্যক্রম পরিচালনা করে।
অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী ডন ফারেল নতুন শুল্ককে ‘সম্পূর্ণ অযৌক্তিক’ বলে মন্তব্য করেছেন। একইভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নও যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, ইউরোপে শ্রমিক সুরক্ষার আইন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী।
এদিকে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার অভিযোগে আরও ১৬টি দেশের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত চলমান রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে নতুন শুল্কব্যবস্থার আওতা আরও বিস্তৃত হতে পারে। সূত্র: বিবিসি
সানা/আপ্র/২৪/৭/২০২৬