গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

মেনু

মোদীর জয়রথ ভেঙে দিলো মমতার দূর্গ, নেপথ্যে পাঁচ কারণ

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১:১০ পিএম, ০৫ মে ২০২৬ | আপডেট: ০১:৩০ এএম ২০২৬
মোদীর জয়রথ ভেঙে দিলো মমতার দূর্গ, নেপথ্যে পাঁচ কারণ
ছবি

নরেন্দ্র মোদী ও মমতা বন্দোপাধ্যায় -ছবি এনডিটিভি

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর রাজনৈতিক অগ্রযাত্রায় বছরের পর বছর ধরেই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য এক বড় ধরনের ব্যতিক্রম হয়ে ছিল।

দেশের রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদীর জয়রথ যখন হিন্দিবলয় মাড়িয়ে পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব ভারতে একের পর এক শক্তিশালী আঞ্চলিক প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছিল, তখনও একগুঁয়ে ব্যতিক্রম হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল পশ্চিমবঙ্গ।

নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্রে ডুবে থাকা এবং তার্কিক মনন বিশিষ্ট এই রাজ্যটি বারবার মোদীর অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু সোমবার রাজ্যটির বিধানসভা নির্বাচনের ফল সেই অচলায়তন ভেঙে দিয়েছে।

ভারতে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন অন্যতম কঠিন এই রাজনৈতিক দূর্গ শেষ পর্যন্ত মোদীর দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সুনামিতে ভেসে গেছে। নির্বাচনে ২৯৩ আসনের মধ্যে ১৪৭টি আসন জিতে নিয়ে প্রথমবারের মতো রাজ্যে সরকার গঠন করতে চলেছে বিজেপি।

১০ কোটিরও বেশি মানুষের এই রাজ্যের ভোটার সংখ্যা জার্মানির মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। ফলে এই নির্বাচন কোনো সাধারণ রাজ্য বিধানসভার ভোট ছিল না, বরং তা ছিল একটি গোটা দেশের সরকার নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ।

মোদীর ১২ বছরের শাসনামলে এই জয় অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ এক অর্জন। এটি কেবল তিন মেয়াদের এক জনপ্রিয় নেত্রীর পরাজয় নয়, বরং পূর্ব ভারতে বিজেপি’র দীর্ঘ পদযাত্রা বা ‘লং মার্চ’-এর চূড়ান্ত বিজয়।

লেখক ও সাংবাদিক নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় বলেছেন, “বিজেপির জন্য বাংলা জয় একটি বিশাল সাফল্য, প্রতিশ্রুতির এমন এক ভূমি যা দীর্ঘদিন তাদের নাগালের বাইরে ছিল।”

এক দশকের দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রকল্প 
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গত অর্ধ শতাব্দীতে কেবল একবার ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছিল। ৩৪ বছর বাম শাসনের পর ১৫ বছর দাপট দেখিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি)।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বাংলাকে এমন এক ব্যবস্থা হিসেবে দেখেন যেখানে একক আধিপত্যবাদী বা ‘হেজেমোনিক’ দলই জয়ী হয়। বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির এই জয় কোনো আকস্মিক মোড় নয়, বরং এক দশকের সুপরিকল্পিত কাজের ফসল।

সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের ফেলো রাহুল ভার্মা জানান, বিজেপি গত তিনটি নির্বাচনে গড়ে ৩৯ শতাংশ ভোট পাচ্ছিল। এবার তারা ৪৪ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে জয়ের রেখা অতিক্রম করেছে।

বিস্ময়কর বিষয় হল, তৃণমূলের মতো শক্তিশালী তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠন না থাকার পরও বিজেপি এই বিপুল জনসমর্থন আদায় করেছে। দলটির এই উত্থানের কারণ কি? এর পেছনে কাজ করেছে ৫ ‘ম’।

১৫ বছর আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘মা, মাটি, মানুষ’- এই তিন ‘ম’-এর শক্তিতে পশ্চিমবঙ্গে বাম শাসনের অবসান ঘটিয়েছিলেন। সেই স্লোগানই পরবর্তীতে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের টানা তিনটি নির্বাচনী জয়ের ভিত্তি হয়ে উঠেছিল।

তবে এবারের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে মমতার সেই ভিত্তি কিছুটা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। নতুন করে পাঁচটি ‘ম’- মুসলিম, মহিলা, অভিবাসী (মাইগ্র্যান্ট), মতুয়া সম্প্রদায় এবং ভারতীয় জনতা পার্টির নির্বাচনি যন্ত্র (মেশিনারি) মমতার জয়ের ধারাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

১. নারী ভোটার
তৃণমূলের সাফল্যের প্রধান ভিত্তি ছিল নারী ভোট। ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ নগদ সহায়তা প্রকল্প এবং ‘কন্যাশ্রী’র মতো প্রকল্পের মাধ্যমে মমতা এই ভোটব্যাংক ধরে রেখেছিলেন।

কিন্তু ২০২৬ সালে নরেন্দ্র মোদী নারী-কেন্দ্রিক নানাবিধ সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই দুর্গে হানা দিয়েছেন। বিশেষ করে আরজি কর মেডিকেল কলেজে এক নারীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাটি নির্বাচনে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নারীদের নিরাপত্তার প্রশ্নে তৃণমূলকে কোণঠাসা করে বিজেপি এই ঘটনায় ভুক্তভোগী ওই নারীর মা-কে পানিহাটি আসন থেকে প্রার্থী করে।

২. মুসলিম ভোট
পশ্চিমবঙ্গের ২৭ শতাংশ মুসলিম ভোটার ঐতিহাসিকভাবে ক্ষমতার নির্ধারক। ২০২১ সালে যেখানে ৩৫ শতাংশের বেশি মুসলিম জনসংখ্যা রয়েছে এমন ৮৫টি আসনের মধ্যে ৭৫টি জিতেছিল তৃণমূল।

কিন্তু ২০২৬ সালে মালদহ, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর দিনাজপুরের মতো জেলাগুলোতে পরিস্থিতির পরিবর্তন দেখা গেছে। এলাকাগুলোতে উন্নয়ন, ভোটার তালিকা এবং সুশাসনের প্রশ্নে অসন্তোষ দানা বেঁধেছে।

তৃণমূল জনকল্যাণমুখী প্রকল্পের ওপর ভরসা করছে। আবার কংগ্রেসও পুনরুজ্জীবীত হওয়ার চেষ্টা করছে। এছাড়া, আসাদউদ্দিন ওয়াইসির দল এআইএমআইএম-ও সম্ভাব্য উদীয়মান ‘ভোট কাটার’ হিসাবে উঠে আসছে।

৩. অভিবাসী ভোটার
অভিবাসীরা এবারের নির্বাচনে এক অনিশ্চিত ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার আতঙ্ক এবং নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে নিজেদের বৈধতা প্রমাণের জন্য হাজার হাজার শ্রমিক বাড়িতে ফিরে এসেছিলেন। বিপুল সংখ্যক এই ভোটারের অংশগ্রহণ নির্বাচনের ফলকে আরও পরিবর্তনশীল করে তুলেছে।

৪. মতুয়া সম্প্রদায় 
পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার ১৭ শতাংশ মতুয়া সম্প্রদায়, যারা মূলত তফসিলি জাতিভুক্ত। এই বিশাল ভোটব্যাংকই বিজেপি-কে রাজ্যে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে গড়ে তুলেছিল। এবারো মতুয়াদের নিরঙ্কুশ সমর্থন বিজেপির জয়ের অন্যতম প্রধান কারিগর হিসেবে কাজ করেছে।

৫. বিজেপির নির্বাচনী যন্ত্র
তৃণমূলকে টেক্কা দিতে বিজেপি এবার তাদের সাংগঠনিক যন্ত্র বা মেশিনারিকে ঢেলে সাজিয়েছিল। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য নেতৃত্বের নিবিড় সমন্বয়, বুথ স্তরের ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল প্রচারণাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায় তারা। তাছাড়া, মাঠ পর্যায়ে সম্পৃক্ততাকেও বিজেপি’র নির্বাচনে ভাল ফল করার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসাবে দেখা হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গ ঐতিহ্যগতভাবে ‘ক্যাডার-চালিত’ রাজ্য (বাম থেকে তৃণমূল), যেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর তৃণমূল স্তরে সুসংগঠিত ক্যাডার বা কর্মী বাহিনী রাজ্যের রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থায় শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে।

বিজেপি এবার তৃণমূলে কংগ্রেসের এই তৃণমূল স্তরের নেটওয়ার্কের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো কিংবা টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ভানু জোশী বলেন, “মমতার দীর্ঘ সাফল্য নির্ভর করত জনকল্যাণ ও সংগঠনের ভারসাম্যের ওপর। কিন্তু সেই সংগঠনই এক সময় তার প্রধান দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়। ভোটাররা এখন সরকারি সুবিধাকে রূপান্তরকারী পরিবর্তনের চেয়ে বরং রুটিন বিষয় হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।”

অন্যদিকে জোশীর মতে, “বিজেপির মূল কৌশল ছিল তৃণমূলের প্রতি মানুষের তৈরি হওয়া বিতৃষ্ণাকে হিন্দুত্ববাদী মেরুকরণের একটি তীক্ষ্ণ ভাষায় বদলে দেওয়া। ফলে এটি কেবল জনকল্যাণের ব্যর্থতা নয়; বরং এটি এমন এক বাস্তবতা যেখানে সরকারি সুবিধা বা দলীয় সাংগঠনিক জোর, কোনোটিই উগ্র সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের স্রোতকে রুখে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত ছিল না।”

মোদীর পর অমিত শাহ?
পশ্চিমবঙ্গে এই বিজয় ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। বাংলার মতো এক শক্তিশালী রাজ্যে এককভাবে বিজেপির এই জয় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে অজেয় প্রমাণ করেছে।

এটি কেবল মোদীর জন্য ব্যক্তিগত রাজনৈতিক জয় নয়, একইসঙ্গে এ জয় ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের অবস্থানকেও দলের ভেতরে হিমালয়সম উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

এই জয় বিজেপির পরবর্তী উত্তরসূরি নির্বাচনেও অমিত শাহকে যোগী আদিত্যনাথ, নীতিন গড়করি বা রাজনাথ সিংয়ের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে রাখতে পারে। দশকের পর দশকজুড়ে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের বাদবাকী অঞ্চলকে নতুন করে রূপান্তরের রাজনৈতিক স্রোতকে রুখে দেওয়ার জন্য গর্বিত ছিল।

বিজেপি শেষ পর্যন্ত ভারতের সেই দুর্ভেদ্য আঞ্চলিক দুর্গেই ফাটল ধরাল। এটি কেবল বাংলার এক যুগেরই সমাপ্তি নয়, বরং মোদী প্রকল্পের এক নতুন অধ্যায়েরই সূচনা।
সানা/আপ্র/৫/৫/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

বাংলাদেশিসহ সব বিদেশিদের জন্য জরুরি বার্তা দিলো মার্কিন দূতাবাস
২৭ জুন ২০২৬

বাংলাদেশিসহ সব বিদেশিদের জন্য জরুরি বার্তা দিলো মার্কিন দূতাবাস

বাংলাদেশিসহ বিদেশি নাগরিকদের উদ্দেশ্যে এক জরুরি সতর্কবার্তা দিয়েছে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস। যুক্তরাষ...

ভেনেজুয়েলায় আবারো ভূমিকম্প
২৭ জুন ২০২৬

ভেনেজুয়েলায় আবারো ভূমিকম্প

শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে লন্ডভন্ড ভেনেজুয়েলার উত্তর উপকূলের কাছে আবারো একটি নতুন ভূমিকম্প আঘাত হেনে...

জাহাজে হামলার জেরে ইরানে মার্কিন হামলা, ফের উত্তেজনা
২৭ জুন ২০২৬

জাহাজে হামলার জেরে ইরানে মার্কিন হামলা, ফের উত্তেজনা

হরমুজ প্রণালিতে একটি মালবাহী জাহাজে ড্রোন হামলার জেরে আবা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা তীব্র...

ইতালিতে একই পরিবারের ৩ বাংলাদেশিকে হত্যা
২৭ জুন ২০২৬

ইতালিতে একই পরিবারের ৩ বাংলাদেশিকে হত্যা

ইতালির রাজধানী রোমের অরেলিও এলাকায় ভয়াবহ এক হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশি একটি পরিবারের তিনজন নিহত হয়েছেন। ঘ...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

২০২৫ সালে সেবা খাতে ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা

দেশের বিভিন্ন সেবা খাতে ২০২৫ সালে ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ আনুমানিক ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, এই পরিমাণ ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। আপনি কি মনে করেন এই জরিপ সঠিক?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে