বুলগেরিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোটে জয়ী হতে যাচ্ছেন দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ইলিয়ানা ইয়োতোভা।
গত রোববার (১ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনের বুথফেরত জরিপে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই গিউরভের চেয়ে বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। প্রাথমিক হিসাবে ইয়োতোভা পেয়েছেন প্রায় ৫৮ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে গিউরভ পেয়েছেন প্রায় ৩৮ শতাংশ। ইতোমধ্যে পরাজয় মেনে নিয়েছেন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী।
সরকারি ফলাফলেও এ ব্যবধান বহাল থাকলে বুলগেরিয়ার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সরাসরি নির্বাচিত নারী প্রেসিডেন্ট হবেন ৬১ বছর বয়সী ইলিয়ানা ইয়োতোভা। দেশটির রাজনীতিতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সোমবার (২ নভেম্বর) প্রকাশিত বুলগেরিয়ার কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের পূর্ণাঙ্গ ফলাফলে ইয়োতোভার জয় নিশ্চিত হয়েছে। কমিশনের হিসাবে, ইয়োতোভা ও তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী কিরিল ভালচেভের যৌথ প্রার্থী দল পেয়েছে ৫৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ ভোট। তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বী আন্দ্রেই গিউরভ ও জর্জি কানদেভের দল পেয়েছে ৩৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ ভোট। প্রায় ২ দশমিক ৯৫ শতাংশ ভোটার কোনও প্রার্থীকে সমর্থন না করার বিকল্প বেছে নিয়েছেন। নির্বাচনে ভোট পড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ।
দেশটির জাতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, ইয়োতোভা ও ভালচেভ পেয়েছেন ১০ লাখ ৯৩ হাজার ৮৫২ ভোট। অন্যদিকে গিউরভ ও কানদেভ পেয়েছেন ৭ লাখ ৫০ হাজার ২৫১ ভোট। দেশের ২৮টি নির্বাচনী এলাকায় জয় পেয়েছে ইয়োতোভার প্রার্থী দল। গিউরভ এগিয়ে ছিলেন তিনটি এলাকায়। বিদেশে বসবাসরত বুলগেরীয়দের ভোটে অবশ্য গিউরভ এগিয়ে ছিলেন।
পরাজয় স্বীকার করে গিউরভ বলেন, বুলগেরিয়ার নাগরিকেরা এভাবেই তাঁদের রায় দিয়েছেন। ফলাফল মেনে নেওয়া উচিত। পশ্চিমাপন্থী উদারপন্থী বিরোধী দলগুলোর সমর্থন নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন তিনি।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে দুই প্রার্থীর অবস্থান: নির্বাচনে ইয়োতোভার জয়ের পেছনে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। তিনি রাশিয়ার সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে সম্পর্ক উন্নয়নের পক্ষে। একই সঙ্গে ইউক্রেনকে নতুন করে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিরোধিতা করে আসছেন। তাঁর বক্তব্য, যুদ্ধের সামরিক সমাধান নেই; কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
অন্যদিকে গিউরভ পশ্চিমাপন্থী ও সংস্কারপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন পেয়েছেন। তিনি ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এবং রাশিয়ার আগ্রাসন বন্ধ না হলে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ কার্যকর হবে না বলে মনে করেন। প্রধানমন্ত্রী রুমেন রাদেভের সঙ্গে ইয়োতোভার রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতাও নির্বাচনে আলোচনার বিষয় ছিল।
রুমেন রাদেভ চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে দাঁড়িয়ে পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশ নেন এবং জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন। তাঁর পদত্যাগের পর তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়োতোভা ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এবারের নির্বাচনে রাদেভের সমর্থন পেয়েছেন ইয়োতোভা। রাদেভের নেতৃত্বাধীন প্রগতিশীল বুলগেরিয়া দলও তাঁর প্রতি সমর্থন জানায়। দলটি পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। ফলে ইয়োতোভার জয় দেশটির ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির অবস্থান আরো সুসংহত করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
কৃষ্ণসাগরে ড্রোন হামলার প্রভাব: নির্বাচনের সময় বুলগেরিয়ার কৃষ্ণসাগর উপকূলের কাছাকাছি বাণিজ্যিক জাহাজে ধারাবাহিক ড্রোন হামলার ঘটনাও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে ওঠে। গত মাসে এসব হামলায় অন্তত ২৪ জন নাবিক নিহত হয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধের প্রভাব কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই এসব হামলাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী রাদেভের বক্তব্য, এসব হামলার পরিণতি রাশিয়ার স্বার্থের অনুকূলে যাচ্ছে। এ ঘটনায় রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতকেও তলব করা হয়েছিল। তবে হামলার সঙ্গে মস্কোর সরাসরি সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে বুলগেরীয় সরকার।
ইয়োতোভা ও গিউরভ দুজনই এসব হামলার নিন্দা জানিয়েছেন এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে হামলার ঘটনায় রাশিয়ার সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তাঁদের অবস্থানে পার্থক্য রয়েছে।
প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ও রাজনৈতিক গুরুত্ব: বুলগেরিয়ায় প্রেসিডেন্টের পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক হলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ভূমিকা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক, আইনসভায় পাস হওয়া আইনে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরসহ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। তবে সরকারের প্রধান নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা পার্লামেন্টের হাতে।
ইয়োতোভা এর আগে সাংবাদিকতা করেছেন। পরে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে জাতীয় পার্লামেন্ট ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৬ ও ২০২১ সালে তিনি রাদেভের সঙ্গে ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন।
নির্বাচনে বিজয়ের পর ইয়োতোভা জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক বিভাজন দূর করা এবং সংলাপের মাধ্যমে কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তাঁর লক্ষ্য, শক্তিশালী ইউরোপের মধ্যে বুলগেরিয়ার অবস্থান আরো দৃঢ় করা এবং পররাষ্ট্রনীতিতে দেশটির সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বজায় রাখা।
আগামী ২২ জানুয়ারি তাঁর অভিষেক হওয়ার কথা। পাঁচ বছরের মেয়াদে দায়িত্ব পালন করবেন তিনি। তাঁর সঙ্গে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেবেন কিরিল ভালচেভ।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরার সরবরাহ করা প্রতিবেদন, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এবং বুলগেরিয়ার জাতীয় বেতার।
সানা/ডিসি/আপ্র/০২/১১/২০২৬