গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

একটি আইফোন, তিনটি প্রাণ—মহারাষ্ট্রের পাহাড়ে শেষ হলো এক পরিবারের গল্প

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১:৫০ পিএম, ২৩ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ১৬:২৮ এএম ২০২৬
একটি আইফোন, তিনটি প্রাণ—মহারাষ্ট্রের পাহাড়ে শেষ হলো এক পরিবারের গল্প
ছবি

ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি

পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে কাঁধ ঝাঁকাচ্ছিল কুনাল। নিচে গভীর খাদ। ওপরে অসহায় মানুষের ভিড়। কেউ তাকে বোঝাচ্ছেন, কেউ অনুনয় করছেন, কেউ বলছেন—ফিরে এসো। আর সবচেয়ে করুণ কণ্ঠটি ছিল মায়ের। নিজের মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ফিরে আসার অনুরোধও যেন কুনালের কাছে পৌঁছাচ্ছিল না।

একসময় সেখানে থাকা একজন তাকে বললেন, ‘তোমার মায়ের জন্য বেঁচে থাকো।’ কুনালের উত্তর ছিল আরও ভয়াবহ—‘না, আমাকে মরতেই হবে। এ ছাড়া আর কোনো পথ নেই।’

এরপর যা ঘটল, তা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো এলাকার মানুষের হৃদয়ে গভীর ক্ষত হয়ে রইল। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি সম্ভাজিনগরের একটি পাহাড় থেকে পড়ে মারা গেলেন ১৮ বছরের কুনাল চাঁদগুডে, তাঁর বাবা মুরালিধর এবং মা সঙ্গীতা।

শুক্রবারের সেই মর্মান্তিক ঘটনার ভিডিও শনিবার ছড়িয়ে পড়ার পর সামনে আসে শেষ মুহূর্তগুলোর ভয়াবহ চিত্র। ঘটনাস্থলে থাকা অনেকের মুঠোফোনের ক্যামেরা তখন চালু ছিল। ফলে কুনালকে ফেরানোর জন্য মানুষের প্রায় তিন ঘণ্টার মরিয়া চেষ্টা এবং পরপর তিনটি প্রাণ হারানোর দৃশ্যের কিছু অংশ ধারণ হয়ে যায়।

কিস্তির টাকা থেকে শুরু
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, কুনাল একটি আইফোন কিনেছিলেন কিস্তিতে। কিন্তু কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে পরিবারের কাছে অর্থ চাইছিলেন তিনি। এ নিয়েই বাবার সঙ্গে তাঁর কথা-কাটাকাটি হয়। উত্তেজিত কুনাল বাড়ি থেকে বেরিয়ে তিসগাঁও এলাকার খাভদিয়া ডোঙ্গর পাহাড়ে উঠে যান।

সকাল তখন প্রায় ১০টা।

ছেলেটি পাহাড়ে উঠে গেছে—খবর পেয়ে বাবা-মাও ছুটে যান। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ ও অগ্নিনির্বাপণকর্মীরা। শুরু হয় এক অসম্ভব চেষ্টা—এক তরুণকে জীবনের দিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা।

কুনাল তখন পাহাড়ের কিনারায়। কেউ কাছে গেলেই তিনি আরও বিপজ্জনক জায়গায় সরে যাচ্ছিলেন। নিচে নিরাপত্তাজাল দেওয়ার চেষ্টাও করা হয়। কিন্তু খাড়া পাহাড় ও কুনালের অবস্থান বদলাতে থাকায় উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়ে।


‘তোমার মায়ের কথা ভাবো’
তিসগাঁওয়ের স্থানীয় নেতা সঞ্জয় যাদবও তখন সেখানে ছিলেন। তিনি এবং অন্যরা বারবার কুনালকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। কেউ তাঁকে ভবিষ্যতের কথা মনে করিয়ে দেন, কেউ মায়ের কথা বলেন।

এমনকি কুনালকে পাহাড় থেকে নামাতে তাঁকে একটি আইফোন কিনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়। কিন্তু কোনো কিছুতেই যেন তাঁর মন গলছিল না।

সঞ্জয় যাদব পরে জানান, তাঁরা অনেক অনুনয়-বিনয় করেছিলেন। কুনাল শিক্ষিত, তাঁর সামনে ভবিষ্যৎ পড়ে আছে—এসব কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু কুনাল বারবার একই অবস্থানে অনড় ছিলেন।

প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলতে থাকে এই অপেক্ষা। একদিকে পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে এক তরুণ; অন্যদিকে তাকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ছুটে চলা মানুষগুলো। সবচেয়ে কাছে ছিলেন তাঁর বাবা-মা।

এক পা এগিয়ে গেলেন বাবা

দুপুর প্রায় ১টা।

আর অপেক্ষা করতে পারলেন না মুরালিধর। ছেলের কাছে পৌঁছে তাঁকে ধরে নিরাপদ জায়গায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন তিনি। ঠিক তখনই কুনাল পাহাড় থেকে লাফ দেন। ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে বাবা নিজেও ভারসাম্য হারিয়ে নিচের খাদে পড়ে যান।

কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সব শেষ।

চোখের সামনে স্বামী ও ছেলেকে পড়ে যেতে দেখেন সঙ্গীতা। সেই দৃশ্যের ধাক্কা তিনি সামলাতে পারেননি। তিনিও পাহাড় থেকে নিচে পড়ে যান।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলেই তিনজনের মৃত্যু হয়। পরে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়। ঘটনার বিষয়ে মামলা করে তদন্ত শুরু হয়েছে।


একটি ফোনের চেয়েও বড় ছিল যে জীবন
ঘটনাটি সামনে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে একটি দামি মুঠোফোন। কিন্তু পুলিশের তদন্তে এখন পর্যন্ত এমন কোনো তথ্য নেই যে শুধু একটি ফোনই এই মর্মান্তিক পরিণতির একমাত্র কারণ ছিল। পুলিশের পক্ষ থেকেও কুনাল মানসিকভাবে কোনো সমস্যায় ভুগছিলেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

তবু ঘটনাটি একটি নির্মম প্রশ্ন রেখে গেছে—একটি সাময়িক চাওয়া, একটি পারিবারিক বিবাদ কিংবা অর্থের সংকট কীভাবে একটি মুহূর্তে জীবনের চেয়েও বড় হয়ে উঠতে পারে?

পাহাড়ের সেই কিনারায় সেদিন কুনালকে ফেরানোর জন্য অনেক মানুষ ছুটে এসেছিলেন। কেউ তাঁকে ভবিষ্যতের কথা বলেছেন, কেউ মায়ের কথা মনে করিয়েছেন, কেউ নতুন ফোন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো কথাই তাঁকে ফিরিয়ে আনতে পারেনি।

সবচেয়ে করুণ হলো—ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে গিয়ে বাবা হারালেন জীবন। স্বামী ও সন্তানকে হারানোর সেই দৃশ্যের পর মা-ও আর ফিরে এলেন না।

একটি পরিবার শেষ হয়ে গেল কয়েক মিনিটের ব্যবধানে। পড়ে রইল শুধু পাহাড়, খাদ আর মানুষের অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার স্মৃতি।

আর সেই স্মৃতি যেন নীরবে বলে যায়—কোনো বস্তু, কোনো চাওয়া, কোনো মুহূর্তের অভিমান কিংবা কোনো আর্থিক সংকটের মূল্য কখনোই একটি জীবনের সমান হতে পারে না।
সানা/আপ্র/২৩/৮/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ, সিজেপির দুই নেতা পাঁচ দিনের হেফাজতে
১৪ অক্টোবর ২০২৬

যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ, সিজেপির দুই নেতা পাঁচ দিনের হেফাজতে

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ প্রদর্শনের ঘটনায় গ্রেফতার ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি...

ফুসফুসের ক্যানসার নিয়ে অস্ত্রোপচারের খবরে পোপকে ঘিরে উদ্বেগ
১৪ অক্টোবর ২০২৬

ফুসফুসের ক্যানসার নিয়ে অস্ত্রোপচারের খবরে পোপকে ঘিরে উদ্বেগ

ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু পোপ চতুর্দশ লিওর ফুসফুসে ক্যানসার শনাক্ত এবং অস্ত্রোপচারের...

১৫ বছরে চাকরি পাবে না ৮০ কোটি তরুণ, ইউএনডিপির সতর্কর্তা
১৪ অক্টোবর ২০২৬

১৫ বছরে চাকরি পাবে না ৮০ কোটি তরুণ, ইউএনডিপির সতর্কর্তা

আগামী ১৫ বছরে উন্নয়নশীল দেশগুলোর শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে যাওয়া প্রায় ১২০ কোটি তরুণের মধ্যে ৮০ কোটিই ক...

কলোনিতে আড়াই মাস পানিসংকট, জাতিসংঘে তৃণমূল নেতার চিঠি
১৪ অক্টোবর ২০২৬

কলোনিতে আড়াই মাস পানিসংকট, জাতিসংঘে তৃণমূল নেতার চিঠি

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার জ্যোতিনগর কলোনিতে দুই মাসের বেশি সময় ধরে পানি সরবরাহ বন্ধ থাকার অভিযোগ উ...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পরিচয় যা-ই হোক, চাঁদাবাজ-দখলদারদের ছাড় নয়: ডিএমপি কমিশনার

চাঁদাবাজ, ভূমি দখলবাজ ও মাদক কারবারে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় বা অবস্থান বিবেচনা না করে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দীন আহমদ। এসব অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে কোনো ধরনের শিথিলতা দেখানো যাবে না বলেও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে ডিএমপি সদর দপ্তরের সম্মেলনকক্ষে সেপ্টেম্বর মাসের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় উপস্থিত ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে এসব নির্দেশনা দেন কমিশনার। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন- কমিশনার যে নির্দেশনা দিয়েছেন, পুলিশ সদস্যরা তা বাস্তবে তা করতে পারবেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 21 ঘন্টা আগে