আর্থিক চাহিদা মেটাতে দেশের গ্রামের প্রায় অর্ধেক পরিবার ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হয়। আনুষ্ঠানিক ঋণের উৎসগুলোর মধ্যে ৪৮ দশমিক ৫১ শতাংশ গ্রামীণ পরিবার ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ পায়। বিপরীতে ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে কৃষি ও অকৃষি খাতে ঋণের সুযোগ রয়েছে মাত্র ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ পরিবারের।
বেসরকারি সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় পরিচালিত ‘সমন্বিত গ্রামীণ অর্থায়ন গবেষণা’ শীর্ষক তিন বছরব্যাপী গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। শনিবার (২২ আগস্ট) ঢাকার গুলশানের একটি হোটেলে আনুষ্ঠানিকভাবে গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়।
গ্রামীণ পরিবার ও প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক পরিস্থিতি, আর্থিক সেবায় প্রবেশাধিকার এবং আর্থিক আচরণ মূল্যায়নের লক্ষ্যে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। এতে নেতৃত্ব দেন ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা কে মুজেরী।
গবেষণার আওতায় দেশের আট বিভাগের ৩৩ জেলার ২ হাজার ৬৪৩টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। জরিপে অংশ নেন ৭ হাজার ৪১ জন। দেশের প্রথম এই গ্রামীণ অর্থায়ন জরিপের পাশাপাশি নীতিপত্র, নীতিসংক্ষেপ ও পটভূমি প্রতিবেদনসহ মোট ২২টি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
জরিপে দেখা যায়, দেশের ৪৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ গ্রামীণ পরিবার কোনো আনুষ্ঠানিক উৎস—ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান—থেকে ঋণ পাওয়ার সুযোগ পায় না। প্রায় ৩০ শতাংশ পরিবার অনানুষ্ঠানিক উৎস, যেমন মহাজন ও আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ঋণ নেয়।
আনুষ্ঠানিক ঋণের উৎসগুলোর মধ্যে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের অবস্থান সবচেয়ে শক্তিশালী। জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারের ৪৮ দশমিক ৫১ শতাংশ ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে মাত্র ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ পরিবারের।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্রুত ও জামানত ছাড়া ঋণ পাওয়ার সুযোগ থাকায় গ্রামীণ এলাকায় ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের বিস্তার বেশি। অন্যদিকে তাৎক্ষণিক নগদ অর্থের প্রয়োজন ও জরুরি পরিস্থিতিতে উচ্চ সুদ হলেও অনানুষ্ঠানিক ঋণের ওপর নির্ভরতা রয়েছে।
জেলা পর্যায়েও আনুষ্ঠানিক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের বৈষম্য দেখা গেছে। বান্দরবানে মাত্র ১৯ শতাংশ পরিবার আনুষ্ঠানিক উৎস থেকে ঋণ পাওয়ার সুযোগ পায়। বিপরীতে নেত্রকোনায় এ হার ৬৮ শতাংশ।
শুধু ঋণ নয়, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সঞ্চয় ও বীমা সেবায় প্রবেশাধিকারেও ঘাটতি রয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, ৫৮ শতাংশ গ্রামীণ পরিবার আনুষ্ঠানিক সঞ্চয় সেবার আওতায় রয়েছে। আর বীমা সেবার সুযোগ পাচ্ছে মাত্র ১৭ শতাংশ পরিবার।
গবেষণার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, মাঠপর্যায়ে বিস্তৃত পরিমাণগত ও গুণগত গবেষণার পাশাপাশি দ্বিতীয় পর্যায়ের তথ্যও ব্যবহার করা হয়েছে। প্রচলিত ও ডিজিটাল—দুই মাধ্যমের ঋণ, সঞ্চয়, পরিশোধ ও বীমাসহ বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সেবা গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান ও ডিজিটাল আর্থিক সেবার প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সাশ্রয়ী সঞ্চয়, ঋণ ও বীমা সেবা বাড়ানো গেলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি আরও জোরদার হবে। এতে গ্রামীণ পরিবারের আর্থিক সক্ষমতাও বাড়বে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. হাবিবুর রহমান বলেন, গ্রামীণ অর্থায়ন নিয়ে এ ধরনের গবেষণার প্রয়োজন ছিল। গবেষণাটি গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য সহায়ক নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভান্ডার হিসেবে কাজ করবে।
তিনি বলেন, গবেষণায় সংগৃহীত তথ্যের মান নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে গিয়ে তথ্য যাচাই করা হয়েছে। গ্রামীণ অর্থায়ন নিয়ে আগ্রহীদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভান্ডার।
অনুষ্ঠানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
সানা/আপ্র/২৩/৮/২০২৬