দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সরকার প্রতিটি জ্বালানি খাতে তিন মাসের মজুত নিশ্চিত করতে কাজ করছে। দায়িত্ব নেওয়ার সময় কোনো কোনো খাতে ১৫ থেকে ১৭ দিনের মজুতও ছিল না। বর্তমানে তা এক মাসে উন্নীত করা সম্ভব হয়েছে এবং ধাপে ধাপে তিন মাসে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
শনিবার (২২ আগস্ট) রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মিলনায়তনে ‘২০২৬ অর্থবছরের দ্বিবার্ষিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি: রাজস্ব ও মুদ্রানীতির প্রেক্ষিত এবং বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এ সেমিনারের আয়োজন করে। এতে ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও নীতিনির্ধারকেরা অংশ নেন।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অর্থনীতির উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি জ্বালানি নিরাপত্তা। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট সমাধানে সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পুনঃগ্যাসীকরণ টার্মিনাল নিয়ে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি স্থলভিত্তিক গ্যাসের উৎস অনুসন্ধান এবং পাইপলাইন সম্প্রসারণের কাজও শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট এক মাসে সমাধান হওয়ার বিষয় নয়। সরকার যে পরিস্থিতি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে, সেখান থেকে যত দ্রুত সম্ভব পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রতিটি জ্বালানি খাতে তিন মাসের মজুত নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি না হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও অর্জন করা সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ঐতিহাসিকভাবে বেসরকারি খাতনির্ভর এবং সরকারের লক্ষ্যও বেসরকারি খাতকে প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে এগিয়ে নেওয়া। সরকারের দায়িত্ব হবে ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ, সহায়তা ও সুবিধা নিশ্চিত করা।
ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধ কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, শুধু নীতিমালা ঘোষণা করলেই হবে না, এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবসায়ীরা কোথাও বাধার মুখে পড়লে তা জানানোর জন্য একটি ওয়েবসাইট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকেও তাদের সদস্যদের সমস্যার বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
কাস্টমস, বন্দর ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবসার ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, একটি বৈঠকেই প্রায় আট থেকে ১০টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমদানি করা পণ্য খালাসে কত সময় লাগবে এবং কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের কোন কাজ কত দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে, সেসব বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হচ্ছে।
খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন কারণে শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিল ও এককালীন নিষ্পত্তির সুযোগ দিয়েছে। যারা ব্যবসা চালিয়ে যেতে চান, তাঁরা পুনঃতফসিলের মাধ্যমে সময় ও ছাড়ের সুযোগ পাবেন। আর ব্যবসা থেকে বেরিয়ে যেতে চান, তাঁরা এককালীন নিষ্পত্তির মাধ্যমে ঋণ পরিশোধ করে বের হতে পারবেন। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে এ সুবিধা কার্যকর হবে।
তিনি বলেন, ব্যাংকের হিসাবের খাতায় এমন সম্পদ দেখিয়ে লাভ নেই, যা বাস্তবে আর ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এসব সম্পদ নিষ্পত্তির মাধ্যমে ব্যাংকের হিসাব পরিষ্কার করতে হবে, যাতে উদ্যোক্তারা নতুন করে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ পান।
ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্যাকেজ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। আর্থিক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ থাকবে না; নির্ধারিত মানদণ্ড ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই সুবিধা দেওয়া হবে।
অর্থমন্ত্রী কুটির শিল্প ও সৃজনশীল অর্থনীতিকে মূলধারায় আনার ওপরও গুরুত্ব দেন। কামার-কুমার, তাঁতি, শীতলপাটি, শতরঞ্জি ও নকশিকাঁথার মতো ঐতিহ্যবাহী পণ্যের উদ্যোক্তাদের ঋণ, দক্ষতা উন্নয়ন, নকশা, ব্র্যান্ডিং ও বিপণন সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগের কথা জানান তিনি। অনলাইনভিত্তিক বিপণনের মাধ্যমে দেশীয় পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর সুযোগও তৈরি করা হবে।
থিয়েটার, চলচ্চিত্র, সংগীত ও খেলাধুলাকে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। এসব খাতের সঙ্গে বিপুল মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত হলেও অর্থনীতিতে সেগুলোর সম্ভাবনাকে এতদিন যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বিনিয়োগের মাধ্যমে এসব খাতকে ঘিরে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির কথা জানান তিনি।
সেমিনারে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকিন আহমেদ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। প্যানেল আলোচনায় ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও গবেষকেরা অংশ নিয়ে ২০২৬ অর্থবছরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, রাজস্ব ও মুদ্রানীতি, বেসরকারি খাতের চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে মতামত দেন।
সানা/আপ্র/২২/৮/২০২৬