শত বছরের মধ্যে নজিরবিহীন তাপপ্রবাহে পুড়ছে জার্মানি ও মধ্য ইউরোপ। অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রায় স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি জার্মানির বিভিন্ন অঞ্চলে দাবানলের আশঙ্কাও তীব্র হয়েছে। পশ্চিম ইউরোপে প্রায় তিন সপ্তাহ এবং মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই তাপপ্রবাহে বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
আবহাওয়াবিদদের মতে, উত্তর আফ্রিকা থেকে আসা উষ্ণ বায়ুর সঙ্গে শক্তিশালী উচ্চচাপ বলয় বা ‘ওমেগা ব্লক’ যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তুলেছে। এই উচ্চচাপ বলয় বায়ুর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে উষ্ণতা দীর্ঘ সময় আটকে রাখছে। এর সঙ্গে উষ্ণ ভূমধ্যসাগর ও মাটির অতিরিক্ত শুষ্কতা যুক্ত হওয়ায় তাপপ্রবাহের তীব্রতা আরো বেড়েছে।
জুনের মাঝামাঝি থেকে স্পেন ও পর্তুগাল হয়ে ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, লুক্সেমবার্গ, যুক্তরাজ্য এবং মধ্য ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে উচ্চচাপ বলয়ের প্রভাব পড়ে। জার্মানির বিভিন্ন এলাকায় শনিবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠেছে। এর আগে ২৮ জুন দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকায় ৩৯ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়।
তীব্র গরমের পাশাপাশি জার্মানির পশ্চিমাঞ্চলের আইফেল এলাকার হুর্টগেনভাল্ডে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। আগুন আবাসিক এলাকার দিকে এগিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় আশপাশের ১৮০ জন বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রায় ৩০০ হেক্টর বনভূমি ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দাবানল নিয়ন্ত্রণে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জরুরি উদ্ধারকর্মী কাজ করছেন। জার্মান সেনাবাহিনীর ১০টি হেলিকপ্টারও আগুন নেভানোর কাজে নিয়োজিত রয়েছে। হেলিকপ্টার থেকে বিপুল পরিমাণ পানি ছিটিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।
তবে হুর্টগেনভাল্ডের দাবানল নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ। ১৯৪৪ ও ১৯৪৫ সালে জার্মান ও মার্কিন সেনাদের মধ্যে তীব্র যুদ্ধের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র ছিল এই বনাঞ্চল। ওই যুদ্ধে প্রায় ২৫ হাজার সৈন্য নিহত হয়। গত শুক্রবারও এলাকায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার বেশ কিছু বিস্ফোরক ও যুদ্ধাস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার রাতের পর বাতাসের গতি কমায় আগুন নতুন এলাকায় ছড়ায়নি। তবে উত্তর দিক থেকে আবার বাতাস প্রবাহিত হওয়ায় পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
তাপপ্রবাহে মৃত্যুর আশঙ্কা: বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার হিসাবে, এবারের তীব্র তাপপ্রবাহে ইউরোপে ১৫ কোটির বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। স্বাস্থ্য, কৃষি, অবকাঠামো ও শ্রম উৎপাদনশীলতার ওপর এর বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। তাপপ্রবাহজনিত কারণে ইউরোপে ২০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কাও প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
জার্মানির রবার্ট কখ ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৬ এপ্রিল থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত দেশটিতে প্রচণ্ড গরমের কারণে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
তবে জার্মানির আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকায় তীব্র গরমের পর এখন আবহাওয়ার পরিবর্তন শুরু হতে পারে। আগামী দিনগুলোতে তাপমাত্রা কমে সর্বোচ্চ ২২ থেকে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকতে পারে। তবে দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে দেশের বেশির ভাগ অঞ্চলে বন দাবানলের ঝুঁকি এখনো অত্যন্ত বেশি থাকবে।
জার্মান ফরেস্ট্রি কাউন্সিলের সভাপতি ক্রিশ্চিয়ান হাসে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে জার্মানিতে দাবানল আরো ঘন ঘন ঘটতে পারে। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আধুনিক আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
এদিকে আইফেল অঞ্চলের দাবানলের পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছেন জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মেরৎস। তিনি ড্যুরেনের জেলা প্রশাসক রালফ নোল্টেনের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে উদ্ধারকর্মী ও সহায়তাকারীদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
সানা/আপ্র/১৭/৮/২০২৬