গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬

মেনু

বিএনপি সরকারের ছয় মাস: প্রত্যাশা কতটা, প্রাপ্তি কতখানি

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ০২:১০ পিএম, ১৭ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ০৩:০১ এএম ২০২৬
বিএনপি সরকারের ছয় মাস: প্রত্যাশা কতটা, প্রাপ্তি কতখানি
ছবি

ছবি এআই দ্বারা নির্মিত

নির্বাচনী অঙ্গীকারের ওপর জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের জন্য ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করেন। লক্ষ্য ছিল দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট সামাল দেওয়া, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি দমন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জ্বালানি-বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং নির্বাচনী ইশতেহারের দৃশ্যমান প্রতিশ্রুতিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন।
    
আজ ১৭ আগস্ট সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হচ্ছে। এর আগে ছয় মাসের কাজের মূল্যায়নে সরকার যেমন বেশ কিছু অর্জনের কথা বলছে, তেমনি বিরোধী রাজনৈতিক দল, অর্থনীতিবিদ ও বিভিন্ন পর্যায়ের নাগরিকদের প্রশ্নও সামনে এসেছে। সরকারের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দাবি করেছেন, ছয় মাসের লক্ষ্য অনুযায়ী মোটামুটি সব কর্মসূচিই পূরণ হয়েছে-কোথাও ৯০, কোথাও ৯৫ এবং কোথাও শতভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে। সরকার শিগগিরই এসব কর্মসূচির বিস্তারিত পরিসংখ্যানসহ লিখিত প্রতিবেদন প্রকাশ করবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

তবে মাঠের বাস্তবতা বলছে, সরকারের অর্জন ও জনগণের প্রত্যাশার মধ্যে এখনো বেশ কিছু জায়গায় দূরত্ব রয়েছে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ-গ্যাস, কর্মসংস্থান ও চাঁদাবাজি-এই পাঁচটি ক্ষেত্রেই সরকারের সামনে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।

 

প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নে: সরকারের শুরুটা ছিল কিছুটা ব্যতিক্রমী। প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পরই মন্ত্রীদের ছয় মাসের কাজের হিসাব দেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধন, ভিআইপি প্রটোকল প্রত্যাহার, তুলনামূলক সাধারণ জীবনযাপন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বার্তা দেন। এসব পদক্ষেপ শুরুতে বিভিন্ন মহলে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচির মধ্যে ছিল পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, কৃষিঋণ মওকুফ, খাল পুনঃখনন, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা, কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা, পরিবেশ, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বৈদেশিক সম্পর্ক। এখন মূল প্রশ্ন-এই পরিকল্পনাগুলো কতটা মানুষের জীবনে পৌঁছেছে?

 

পরিবার কার্ডে বড় প্রতিশ্রুতির পরীক্ষামূলক বাস্তবায়ন: বিএনপির অন্যতম আলোচিত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল পরিবার কার্ড। পরিবারের নারী প্রধানের হাতে সরাসরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার এই কর্মসূচি সরকারের সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। 
মানবজমিনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটের পর মাত্র ১৯ দিনের মাথায় পরিবার কার্ডের মাধ্যমে মাসে আড়াই হাজার টাকা দেওয়ার কর্মসূচি শুরু হয়। আগামী চার বছরে এক কোটি ৬০ লাখ পরিবারকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।

তবে এখানেই সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ-কার্ডের সংখ্যা নয়, উপকারভোগী নির্বাচন কতটা নির্ভুল হবে। রাজনৈতিক প্রভাব, মধ্যস্বত্বভোগী ও অনিয়ম থেকে কর্মসূচিকে মুক্ত রাখতে না পারলে এই উচ্চাভিলাষী সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্পও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

 

কৃষক কার্ড ও ঋণ মওকুফে দৃশ্যমান উদ্যোগ: কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড চালু এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ সরকারের অন্যতম বাস্তব পদক্ষেপ। একই সঙ্গে কৃষির সেচ ও জলাধার সুবিধা বাড়াতে দেশজুড়ে খাল পুনঃখননের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। কৃষকের জন্য এই উদ্যোগগুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানো, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, সার-বীজের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং কৃষিপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙার ওপর।

 

দ্রব্যমূল্যে স্বস্তি এসেও আসছে না: সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় সাধারণ মানুষের প্রধান উদ্বেগ ছিল বাজারদর। ছয় মাস পরও এটি সরকারের অন্যতম বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। জুলাইয়ে দেশের সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে, যা জুনের ৯ দশমিক ১৬ শতাংশের তুলনায় কম। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে। তবে সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

অর্থাৎ পরিসংখ্যানের হিসাবে কিছুটা স্বস্তি এলেও বাজারে মানুষের অনুভূত চাপ এখনো যথেষ্ট। কারণ মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; বরং দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমা। সীমিত ও মধ্যম আয়ের মানুষের কাছে এ পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের সামনে তাই এখন শুধু মূল্যস্ফীতির হার কমানোর নয়, মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ।

 

সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা আইনশৃঙ্খলা: ছয় মাসে সরকারের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সম্ভবত আইনশৃঙ্খলা নিয়ে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দুর্বল হয়ে পড়া পুলিশ বাহিনীকে পুনর্গঠন, মনোবল ফিরিয়ে আনা এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকারকে শুরু থেকেই কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। মানবজমিনের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, চাঁদাবাজি প্রত্যাশিত মাত্রায় বন্ধ করা যায়নি। কিশোর গ্যাং, ছিনতাই, রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও বিভিন্ন অপরাধ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

স্বাধীনভাবেও একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। কমিউনিস্ট পার্টি বাংলাদেশ অভিযোগ করেছে, নির্বাচনের পাঁচ মাস পরও আইনশৃঙ্খলার দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি; বরং মব সহিংসতা, চাঁদাবাজি, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং রাজনৈতিক সংঘর্ষ নিয়ে জননিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। অবশ্য বিরোধী দলের এসব অভিযোগকে সরকারের ব্যর্থতার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে নেওয়া যায় না। তবে অভিযোগগুলো যে ব্যাপকভাবে উঠছে, সেটিই দেখাচ্ছে-আইনশৃঙ্খলা এখনো সরকারের সবচেয়ে বড় জনমত-পরীক্ষা। জাতীয় অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহও সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ছয় মাসে একটি সরকারের পূর্ণ মূল্যায়ন সম্ভব নয়। তবে তাঁর পর্যবেক্ষণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি, বিশেষ করে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি রয়েছে।

 

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি: সরকারের অপ্রত্যাশিত বড় ধাক্কা: সরকারের প্রথম ছয় মাসের সবচেয়ে বড় অপ্রত্যাশিত সংকট এসেছে জ্বালানি খাতে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়। পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন, জ্বালানি সংকট এবং এর প্রভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে বাজার ও দোকানপাটের সময় কমানোর মতো পদক্ষেপ নিতে হয়। পরে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

এরপর মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে ত্রুটির কারণে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। এর প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানায়। কয়েকটি শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে রাজনৈতিক চাপও বাড়ে। এখানে সরকারের পক্ষে একটি যুক্তি অবশ্যই আছে-আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। কিন্তু জনগণের বিচারে সরকারকে মূল্যায়ন করা হবে সংকটের কারণ দিয়ে নয়, সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা দিয়ে।

 

অর্থনীতির ভাঙন পুনরুদ্ধার এখনো অসম্পূর্ণ: বিএনপি সরকার এমন সময়ে দায়িত্ব নেয়, যখন অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং রাজস্ব ঘাটতির মতো দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা ছিল।

ছয় মাসে অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক সূচক দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ অর্থনীতিকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। জুলাইয়ে প্রবাসী আয় এসেছে প্রায় ২৮৬ কোটি ডলার।

কিন্তু অর্থনীতির প্রকৃত পুনরুদ্ধার বোঝার জন্য শুধু রেমিট্যান্স যথেষ্ট নয়। বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান, ব্যাংকঋণ, রপ্তানি এবং মানুষের মাথাপিছু প্রকৃত আয়-এসব সূচকেও স্থায়ী উন্নতি দরকার। এখানেই সরকারের সামনে বড় কাজ পড়ে আছে।


ব্যাংক খাতে পুরোনো ক্ষত এখনো রয়ে গেছে: সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় ব্যাংকিং খাত ছিল অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বল জায়গাগুলোর একটি। বিশেষ করে আগের সরকারের সময় বিতর্কিত ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকা কয়েকটি ব্যাংকের সংকট মোকাবিলায় সরকার একাধিক ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নেয়।

কিন্তু ব্যাংক একীভূত করাই সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। খেলাপি ঋণ আদায়, পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি, আমানতকারীর নিরাপত্তা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা বাড়ানো-এই জায়গাগুলোতে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া অর্থনীতির ভিত শক্ত হবে না।

 

কর্মসংস্থানে প্রতিশ্রুতির তুলনায় বাস্তব অগ্রগতি কম: নির্বাচনের আগে বিএনপির অন্যতম বড় প্রতিশ্রুতি ছিল কর্মসংস্থান সৃষ্টি। তরুণদের কর্মমুখী শিক্ষা, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, বিদেশে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিদেশি শ্রমবাজার সম্প্রসারণে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সফরের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বন্ধ কলকারখানা চালুর কাজও চলছে।

কিন্তু ছয় মাসে ব্যাপক নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির দৃশ্যমান ফল এখনো পাওয়া যায়নি। এটিই আগামী ছয় মাসে সরকারের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক পরীক্ষাগুলোর একটি।

কারণ বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর কাছে কর্মসংস্থান শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে উদ্যোগ আছে, ফল পেতে সময় লাগবে: শিক্ষার্থীদের স্কুল পোশাক, জুতা ও পাটের তৈরি ব্যাগ দেওয়ার উদ্যোগ, ক্রীড়া কার্যক্রম, নতুন কুঁড়ি কর্মসূচি পুনরুজ্জীবন এবং শিক্ষার্থীদের মাদক থেকে দূরে রাখতে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন সরকারের সামাজিক বিনিয়োগের অংশ।

স্বাস্থ্য খাতেও হাম মোকাবিলায় দ্রুত টিকা সংগ্রহ ও টিকাদান কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। প্রবীণ ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য রেল ও মেট্রোরেলে ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্তও সামাজিক কল্যাণমূলক উদ্যোগ হিসেবে এসেছে।

তবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য-দুটিই এমন খাত, যেখানে ছয় মাসে বড় পরিবর্তন মাপা কঠিন। হাসপাতালের সেবা, চিকিৎসক-নার্সের সংকট, বিদ্যালয়ের মান, শিক্ষার্থীর ঝরে পড়া এবং কর্মমুখী শিক্ষার বাস্তব ফল-এসবের পরিবর্তন দেখতে আরো সময় লাগবে।

 

প্রশাসন পরিবর্তন হয়েছে, প্রশ্নও উঠেছে: আগের সরকারের দীর্ঘ সময়ের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে বিএনপির অভিযোগ ছিল ব্যাপক দলীয়করণের। দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার প্রশাসনে রদবদল ও শুদ্ধি অভিযান চালিয়েছে।

জাতীয় অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহ মানবজমিনকে বলেছেন, আগের সরকারের সময় তৈরি প্রশাসন নিয়ে কাজ করা কঠিন ছিল; দক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রশাসন পুনর্গঠনের প্রয়োজন ছিল। তবে তিনি একই সঙ্গে বলেছেন, প্রকৃত অর্থে ভালো কর্মকর্তা খুঁজে পাওয়াও বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগও সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ পরিবর্তনের পর নতুন নিয়োগগুলো কতটা যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে হয়েছে, সেটি বোঝা যাবে সংশ্লিষ্টদের পরবর্তী কর্মকাণ্ডে।

এখানে সরকারকে সবচেয়ে সতর্ক থাকতে হবে একটি বিষয়ে-দলীয়করণের অভিযোগ যেন শুধু পক্ষ বদলের অভিযোগে পরিণত না হয়।

 

পররাষ্ট্রনীতিতে ‘বাংলাদেশ প্রথম’ ভাবনা: বিএনপি সরকার পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে। চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতায় সাজানোর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ইতিবাচক পথে ফেরানোর তৎপরতাও দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সরকারের প্রথম ছয় মাসকে তাই সংঘাতের বদলে বাস্তব স্বার্থকেন্দ্রিক সম্পর্ক তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যায়। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে বিনিয়োগ, বাণিজ্য, শ্রমবাজার ও কূটনৈতিক স্বার্থে বাংলাদেশ কতটা বাস্তব সুবিধা অর্জন করতে পারে তার ওপর।

 

পরিবেশ ও অবকাঠামোয় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা: দেশজুড়ে খাল পুনঃখনন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, ঢাকার বায়ুদূষণ কমাতে পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক বাস চালুর উদ্যোগ এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণ সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ।

পদ্মা ব্যারেজ, তিস্তা ব্যারেজ এবং রাজধানীর গাবতলী থেকে আফতাবনগর পর্যন্ত দ্বিতীয় মেট্রোরেল প্রকল্পের মতো পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি ও যোগাযোগে বড় প্রভাব পড়তে পারে। তবে প্রকল্প গ্রহণের চেয়ে বাস্তবায়ন, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়নই হবে আসল পরীক্ষা।

 

সরকারের দাবি বনাম বাস্তবতার আয়না: সরকারের পক্ষের সবচেয়ে জোরালো বক্তব্য-ছয় মাসের লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। রুহুল কবির রিজভীর ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো কর্মসূচি পুরোপুরি এবং অন্যগুলো ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়েছে। পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড ও খাল খননসহ বিভিন্ন কর্মসূচির পরিসংখ্যান নিয়ে সরকার আলাদা প্রতিবেদনও প্রকাশ করতে যাচ্ছে।

কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধী মহলের মূল্যায়ন সম্পূর্ণ ভিন্ন। জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টি সরকারের ছয় মাসে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন, শিক্ষাঙ্গনে সহিংস রাজনীতি বন্ধ, অর্থনৈতিক স্থবিরতা দূর, জ্বালানি নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ব্যর্থতার অভিযোগ করেছে।

বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানও গ্যাস, বিদ্যুৎ, আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেছেন। দুই পক্ষের বক্তব্যের মাঝখানেই সম্ভবত প্রকৃত মূল্যায়নটি রয়েছে।

 

ছয় মাসে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কী: সবকিছু বিবেচনায় বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে কয়েকটি বিষয়কে উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তি বলা যায়।

প্রথমত, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতিকে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় নিয়ে এসেছে। দ্বিতীয়ত, পরিবার কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো নতুন সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোর পরীক্ষামূলক বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। তৃতীয়ত, কৃষিঋণ মওকুফ, খাল পুনঃখনন, খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চতুর্থত, সরকারি ব্যয়ে সংযম এবং ভিআইপি সংস্কৃতি কমানোর কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পঞ্চমত, বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা রয়েছে।

 

সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা বা অপূর্ণতা কোথায়: অন্যদিকে কয়েকটি ক্ষেত্রে সরকার এখনো প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। চাঁদাবাজি নিয়ে জনঅভিযোগ রয়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট শিল্প ও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। মূল্যস্ফীতি কমলেও বাজারদর মানুষের নাগালের মধ্যে পুরোপুরি আসেনি। কর্মসংস্থানে বড় ধরনের দৃশ্যমান পরিবর্তন এখনো হয়নি। প্রশাসন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

অর্থাৎ সরকারের উদ্যোগের ঘাটতি যতটা নয়, তার চেয়ে বড় ঘাটতি হচ্ছে উদ্যোগের দ্রুত ও দৃশ্যমান ফল সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছানো।

 

ছয় মাসের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা সামনে: ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার প্রথম পর্যায় শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকার এখন পর্যবেক্ষণ থেকে বাস্তবায়নের আরো কঠিন পর্যায়ে যাচ্ছে। মানবজমিনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছয় মাসের পর্যবেক্ষণ শেষে সরকার এখন কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নে আরো জোরালো পদক্ষেপ নিতে চায়। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কর্মদক্ষতাও মূল্যায়নের আওতায় আসতে পারে এবং দুর্বল কর্মদক্ষতার ক্ষেত্রে দপ্তর পুনর্বণ্টনের সম্ভাবনাও রয়েছে।

এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি নির্বাচিত সরকারের প্রথম ছয় মাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হওয়া উচিত-কোথায় পরিকল্পনা কাজ করেছে, কোথায় ব্যর্থ হয়েছে এবং কোন মন্ত্রণালয় প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করতে পারেনি।

সরকার যদি এই মূল্যায়নকে সত্যিকার অর্থে জবাবদিহির প্রক্রিয়ায় পরিণত করতে পারে, তাহলে ছয় মাসের অভিজ্ঞতা পরবর্তী ছয় মাসের জন্য শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

 

শেষ বিচারে প্রাপ্তির চেয়ে প্রত্যাশাই বড়: বিএনপি সরকার এমন একটি সময়ে ক্ষমতায় এসেছে, যখন জনগণের প্রত্যাশা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর মানুষ শুধু সরকার পরিবর্তন চায়নি; তারা চেয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনার ধরনে পরিবর্তন। তাই পরিবার কার্ড বা কৃষক কার্ডের মতো একটি-দুটি কর্মসূচি দিয়ে এই প্রত্যাশা পূরণ হবে না। মানুষ চায় নিরাপদে চলাফেরা করতে, ন্যায্যমূল্যে বাজার করতে, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস পেতে, সন্তানের চাকরির নিশ্চয়তা দেখতে এবং সরকারি অফিসে হয়রানি ছাড়া সেবা নিতে। এই জায়গাতেই বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসের প্রকৃত মূল্যায়ন।
ছয় মাসের হিসাব বলছে-সরকারের হাতে উদ্যোগের ঘাটতি নেই, কিন্তু দৃশ্যমান ফলের ঘাটতি এখনো আছে।

সরকারের সামনে তাই আগামী ছয় মাসের মূল চ্যালেঞ্জ হবে তিনটি-বাজারে স্বস্তি ফেরানো, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কর্মসংস্থানের দৃশ্যমান সুযোগ তৈরি করা। একই সঙ্গে প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

কারণ শেষ পর্যন্ত সরকারের সাফল্য মাপা হবে কতটি কর্মসূচি ঘোষণা হয়েছে কিংবা কতটি সভা হয়েছে তা দিয়ে নয়; মানুষের জীবন কতটা সহজ হয়েছে, রাষ্ট্রের ওপর মানুষের আস্থা কতটা ফিরেছে এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তব সুবিধা সাধারণ মানুষ পেয়েছে-তার ওপরই নির্ভর করবে বিএনপি সরকারের প্রথম মেয়াদের ইতিহাস। আর সেই বিচারে প্রথম ছয় মাসকে বলা যায়-প্রত্যাশা পূরণের যাত্রা শুরু হয়েছে, কিছু অর্জনও দৃশ্যমান; কিন্তু জনগণের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের দূরত্ব এখনো যথেষ্ট।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকারি নথি ও মানবজমিনসহ দেশীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।
সানা/আপ্র/১৭/৮/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

ইঞ্জিন বিকল, খাবার-পানি শেষ; ভূমধ্যসাগরে ১১ বাংলাদেশির মৃত্যু
১৬ আগস্ট ২০২৬

ইঞ্জিন বিকল, খাবার-পানি শেষ; ভূমধ্যসাগরে ১১ বাংলাদেশির মৃত্যু

অভিবাসনপ্রত্যাশায় টানা নয় দিন ভেসে থাকার পর

বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরে সহযোগিতায় আগ্রহী লিথুনিয়া
১৬ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরে সহযোগিতায় আগ্রহী লিথুনিয়া

বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, ডিজিটাল রূপান্তর ও সাইবার নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে সহযোগিতার আগ্রহ প্...

অব্যবহৃত জলাশয় তরুণদের মধ্যে বণ্টন করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে: প্রধানমন্ত্রী
১৬ আগস্ট ২০২৬

অব্যবহৃত জলাশয় তরুণদের মধ্যে বণ্টন করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে: প্রধানমন্ত্রী

দেশের অব্যবহৃত পুকুর, হাওর, বিল ও অন্যান্য জলাশয় সংস্কার করে মাছের পোনা অবমুক্ত করার পাশাপাশি এসব জল...

পাঁচ বছরের ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের সুযোগ দেবে ডিএসসিসি
১৬ আগস্ট ২০২৬

পাঁচ বছরের ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের সুযোগ দেবে ডিএসসিসি

ব্যবসায়ীদের সুবিধার জন্য একবারে পাঁচ বছরের ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের সুযোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকা দক...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

বিএনপি সরকারের ছয় মাস: প্রত্যাশা কতটা, প্রাপ্তি কতখানি

আজ ১৭ আগস্ট সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হচ্ছে। এর আগে ছয় মাসের কাজের মূল্যায়নে সরকার যেমন বেশ কিছু অর্জনের কথা বলছে, তেমনি বিরোধী রাজনৈতিক দল, অর্থনীতিবিদ ও বিভিন্ন পর্যায়ের নাগরিকদের প্রশ্নও সামনে এসেছে। সরকারের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দাবি করেছেন, ছয় মাসের লক্ষ্য অনুযায়ী মোটামুটি সব কর্মসূচিই পূরণ হয়েছে-কোথাও ৯০, কোথাও ৯৫ এবং কোথাও শতভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে। প্রিয় পাঠক, সরকার ভালো করছে নাকি মন্দ করছে? হ্যাঁ বা না জানান।

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 18 মিনিট আগে