ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস অঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ৫১ জন নিহত ও বহু মানুষ আহত হওয়ার পর প্রশান্ত মহাসাগর ঘিরে থাকা ‘রিং অব ফায়ার’ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সময়ে কলম্বিয়া ও ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঘটনাও এ অঞ্চলের ভূকম্পনঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, একের পর এক ভূমিকম্প ঘটলেই পুরো ‘রিং অব ফায়ার’ অস্বাভাবিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
শনিবার (১৫ আগস্ট) ভোরে ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব নুসা টেঙ্গারা প্রদেশের ফ্লোরেস অঞ্চলে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। স্থানীয় সময় সকাল ৫টা ৫৮ মিনিটে ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে ভূমিকম্পটির উৎপত্তি হয়। এর কেন্দ্র ছিল এন্ডে শহর থেকে প্রায় ৬৮ কিলোমিটার উত্তর-উত্তরপশ্চিমে।
ভূমিকম্পের পর ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব উপকূলে সুনামি সতর্কতা জারি করা হলেও পরে তা প্রত্যাহার করা হয়। এপি জানিয়েছে, রিউং এলাকায় সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৬১ মিটার এবং এন্ডে রেসিডেন্সির মাউরোলে ৯৪ সেন্টিমিটার উচ্চতার সুনামির ঢেউ রেকর্ড করা হয়েছে।
প্রথম কম্পনের পর অন্তত ২৩৫টি পরাঘাত বা আফটারশক অনুভূত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালীটির মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ২।
ভূমিকম্পে ভূমিধস ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় ফ্লোরেসের দুর্গম এলাকাগুলোতে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। ১৫০টির বেশি ঘরবাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস বা মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনাও। প্রায় ২ হাজার মানুষকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে এবং শতাধিক সরকারি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
ফ্লোরেস অঞ্চলে ভূমিকম্পের সঙ্গে সুনামির ভয়াবহতার ইতিহাসও রয়েছে। ১৯৯২ সালে একই অঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর সুনামিতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
কেন ইন্দোনেশিয়ায় এত ভূমিকম্প: ইন্দোনেশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’-এর অন্যতম সক্রিয় অংশে অবস্থিত। প্রশান্ত মহাসাগরকে ঘিরে ঘোড়ার খুরের মতো বিস্তৃত এই অঞ্চলে একাধিক টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষ ও পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া ঘটে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভূমিকম্পগুলোর প্রায় ৮১ শতাংশ এই প্রশান্ত মহাসাগরীয় ভূকম্পন বলয়ে ঘটে। বিশেষ করে সাবডাকশন অঞ্চলে একটি টেকটোনিক প্লেট অন্যটির নিচে ঢুকে যাওয়ার সময় বিপুল শক্তি সঞ্চিত হয়। সেই শক্তি হঠাৎ মুক্ত হলে শক্তিশালী ভূমিকম্প ও কখনো কখনো সুনামি সৃষ্টি হয়।
তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে পুরো ‘রিং অব ফায়ার’ অস্বাভাবিকভাবে জেগে ওঠার প্রমাণ হিসেবে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প দূরবর্তী এলাকায় ছোটখাটো কম্পনকে প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন দূরবর্তী অঞ্চলে কাছাকাছি সময়ে ভূমিকম্প হওয়া মানেই সেগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত বা পুরো ভূকম্পন বলয় একযোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছে-এমন নয়।
কলম্বিয়া ও ভেনেজুয়েলাতেও বড় কম্পন: ইন্দোনেশিয়ার ভূমিকম্পের কয়েক দিন আগে পশ্চিম কলম্বিয়ায় ৭ দশমিক ৪ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। চলতি শতাব্দীতে দেশটিতে এটি অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এতে ২৫০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু এবং ৩০০ জনের বেশি নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার মতে, কলম্বিয়ার ভূমিকম্পটি ছিল ‘স্ট্রাইক-স্লিপ’ ধরনের। অর্থাৎ টেকটোনিক প্লেটের অনুভূমিকভাবে পরস্পরের বিপরীত দিকে সরে যাওয়ার কারণে সেখানে ভূকম্পন সৃষ্টি হয়েছে।
এর আগে জুনে ভেনেজুয়েলায় মাত্র ৩০ সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। সেখানেও ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে।
রিং অব ফায়ারের বিস্তৃত ঝুঁকি: ‘রিং অব ফায়ার’-এর প্রভাব শুধু ইন্দোনেশিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। জাপান, ফিলিপাইন, নিউজিল্যান্ড, আলাস্কা, যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চল, মেক্সিকো, মধ্য আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলও এ ভূকম্পন বলয়ের অন্তর্ভুক্ত।
২০১১ সালে জাপানের তোহোকুতে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর ভয়াবহ সুনামি আঘাত হানে। ১৯৬৪ সালে আলাস্কায় ৯ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পও ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে রেকর্ড হয়েছে।
পৃথিবীর শক্ত বহিরাবরণ কয়েকটি টেকটোনিক প্লেটে বিভক্ত। এসব প্লেট ক্রমাগত নড়াচড়া করছে। কোথাও তারা পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, কোথাও একটি প্লেট অন্যটির নিচে ঢুকে যায়, আবার কোথাও পাশাপাশি সরে যায়। এই চলাচলের সময় সঞ্চিত শক্তি হঠাৎ মুক্ত হলেই ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।
তাই ইন্দোনেশিয়া, কলম্বিয়া বা ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলো ‘রিং অব ফায়ার’-এর ভূতাত্ত্বিক সক্রিয়তার স্বাভাবিক ধারার অংশ হলেও এগুলো থেকে পুরো অঞ্চল একযোগে অস্বাভাবিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে-এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো নেই।
সানা/আপ্র/১৭/৮/২০২৬