দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য ‘এক নাগরিক, এক ডিজিটাল পরিচয়, এক ডিজিটাল ওয়ালেট’ নীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ জানিয়েছেন, জন্মের পর থেকেই একটি শিশুর জন্য ডিজিটাল পরিচয় চালু করা হবে, যা সরাসরি যুক্ত থাকবে একটি ডিজিটাল ওয়ালেটের সঙ্গে। এই ওয়ালেট ব্যাংক ও মুঠোফোনভিত্তিক আর্থিক সেবার সঙ্গে সংযুক্ত করা যাবে। দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের জন্য এ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘নতুন টেলিযোগাযোগ নীতিমালা: উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারটির আয়োজন করে টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ।
দেশে মুঠোফোন ও ব্রডব্যান্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেশি হলেও সেবার মান বিশ্বের অন্যতম নিম্নমানের বলে মন্তব্য করেন উপদেষ্টা। এ পরিস্থিতি উন্নয়নে সরকারের অগ্রাধিকার তুলে ধরে তিনি বলেন, সংযোগ ব্যবস্থাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের লক্ষ্য ৯০ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে পঞ্চম প্রজন্মের মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতায় আনা এবং ব্যবহারকারীদের প্রতি সেকেন্ডে ১০০ মেগাবিট গতির ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থা চালু, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসার এবং মুঠোফোন সেবায় কর হ্রাসের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। ব্রডব্যান্ড সেবার দুর্বলতা কাটাতে দ্রুত অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
উপদেষ্টা আরও বলেন, দেশে এখনো প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে স্মার্টফোন নেই। ডিভাইসের দাম কমিয়ে আনা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। স্মার্টফোনের মূল্য আড়াই থেকে তিন হাজার টাকার মধ্যে নামিয়ে আনতে কাজ চলছে, যাতে কৃষক, দিনমজুর ও রিকশাচালকের মতো সাধারণ মানুষও সহজে এসব ডিভাইস ব্যবহার করতে পারেন।
মুঠোফোন সেবায় করের উচ্চহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ খাতে বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়কারী দেশ। বর্তমানে একজন গ্রাহক ১০০ টাকা রিচার্জ করলে মাত্র ৬২ টাকার সেবা পান, বাকি ৩৮ টাকা কর হিসেবে সরকার নিয়ে নেয়। এ অবস্থার পরিবর্তনে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে ১০০ টাকায় ৮০ থেকে ৯০ টাকার সেবা পাওয়া যায়।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির। তিনি অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক কিছু নীতি ও নির্দেশনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্ন স্তরে লাইসেন্স দেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে অবকাঠামো খাতে এক বা দুটি প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য সৃষ্টি করতে পারে। এতে সেবার মূল্য নির্ধারণে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি তৈরি হবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ফাইবার নেটওয়ার্ক, আন্তর্জাতিক প্রবেশপথ ও ডেটা সেন্টার বিদেশি নিয়ন্ত্রণে গেলে ডেটার সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে এবং নজরদারির ঝুঁকি বাড়তে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এ সময় ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জ, আন্তর্জাতিক গেটওয়ে এবং ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন তাঁদের মতামতের যথাযথ গুরুত্ব না দিয়েই নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করছে। তাঁরা নতুন সরকারের কাছে নীতিমালা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে কমিশনের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী বলেন, নীতিমালা প্রণয়নের সময় শিল্পখাত, শিক্ষাবিদ ও সরকারি সংস্থার সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা করা হয়েছে। পুরো খাতের স্বার্থ সংরক্ষণই এ নীতিমালার মূল লক্ষ্য। নতুন সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে নীতিমালাটি আবারও পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি সমীর কুমার দে এবং সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক মাসুদুজ্জামান রবিন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাসুদ কামাল, ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সংগঠনের সভাপতি আমিনুল হাকিম, একটি ফাইবার অবকাঠামো প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মইনুল হক সিদ্দিকী এবং মোবাইল অপারেটরদের সংগঠনের মহাসচিব মোহাম্মদ জুলফিকার প্রমুখ।
সানা//আপ্র/২৬/৪/২০২৬